মন ফড়িং ❤ ৩৮.

1
743

মন ফড়িং ❤ ৩৮.

নিদ্রের কাছ থেকে ডিটেইলস জানার পরে নীলুফার রাগীস্বরেই বললেন
– জীবন্ত ইবলিশ ছিলো। অদ্রির জায়গায় আমি থাকলে গুলি করে মারতাম লোকটাকে। লোকটার নাম কী যেন বললেন?
– ইখলাস।
– নামটা তো সুন্দর তাহলে মানসিকতা এতো নিচু কেনো? আল্লাহ জানেন।
নিদ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন
– আপনি মুসলিম?
নীলুফার হেসে বললেন
– হ্যাঁ। আমার বাবা ইইন্টারেসটিং ক্যারেক্টারের লোক ছিলেন। নাম শুনে মানুষ যেন উল্টোটা ভাবে – এই কারণে এই নাম! বাবার এই ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টরের কারণে বেশ ঝামেলায় পড়তে হতো স্কুল, কলেজ লাইফে। এমনকি অফিসিয়াল কাজেও অনেকে ভাবতেন ভুল নাম লিখেছি। কিছু প্রশ্ন করবো, সঠিক উত্তর দিবেন। কোনো রকম লজ্জা পাওয়ার কিছুই নেই।
– অবশ্যই চেষ্টা করবো।
– আপনাদের সেক্সুয়াল লাইফটা কেমন? আপনার স্ত্রী কি ইঞ্জয় করেন নাকি বিরক্ত হন?
নিদ্র লজ্জায় মাথা নিচু করে কিছু একটা ভাবতে শুরু করলো।
নীলুফার বললেন
– আপনি তো ভালোভাবেই বুঝবেন অদ্রি বিরক্ত হচ্ছে কিনা? প্রশ্নটা অদ্রিকেই করতাম কিন্তু তার আগেই উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
– ও বিরক্ত হয়না। আমার সঙ্গ ও খুব পছন্দ করে।
নীলুফার ডায়েরিতে কিছু একটা লিখতে শুরু করলেন। তারপর বললেন
– প্রশ্নটা করার কারণ হচ্ছে, অনেক মেয়েই সেক্সুয়াল ব্যাপার গুলো তেমন পছন্দ করেনা। আপনার স্ত্রী প্রথম বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গ পাননি এবং ওইসময় ওনার বয়সও কম ছিলো। এই অবস্থায় অন্য পুরুষের সঙ্গ চাইতেই পারে। কিন্তু তিনি উল্টোটা করেছেন।
আর আপনাদের ভেতর মেন্টাল বন্ডিং টা বেশ স্ট্রং, সেক্ষেত্রে ফিজিক্যাল বন্ডিং সম্পর্কে জানাটা দরকার ছিলো।
অদ্রি আপাতত বেশ অসুস্থ। সুস্থ হলে বাচ্চা নেয়ার চেষ্টা করবেন। যত তাড়াতাড়ি ভয়টাকে পিষে ফেলা যায়।
– অদ্রি মনে করে, ও আমার সাথে থাকলে ইখলাস সাহেব আমার ক্ষতি করবেন। এইজন্য সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিলো। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়।
– ব্যাপারটা তো ক্রিটিকাল। ওনার কল্পনাশক্তি প্রবল এবং সত্যিই ইখলাস সাহেবকে দেখতে পান। এমনকি ওনাদের মধ্যে কথাবার্তাও হয়। আপনার স্ত্রী একবিন্দুও মিথ্যা কথা বলছেন না।
– মৃত মানুষ কীভাবে আসবে? আমি ওনার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পর্যন্ত দেখেছি।
– মৃত মানুষ ফিরে আসেনা। আপনার স্ত্রীর ধারণা ইখলাস ওনাকে অন্যের সাথে সুখে থাকতে দিবেনা। এমনকি আপনার ক্ষতি করবে। ধারণাও বলা যায়না, বিশ্বাস বলা যায়। আপনার স্ত্রীর মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমি আপাতত কোনো মেডিসিন দিবোনা। ওনার শুধু মেডিসিন না কাউন্সিলিং এরও প্রয়োজন হতে পারে। মোটামুটি সুস্থ হবার পরে আবার আসবেন। তখন আমি আপনাদেরকে সাহায্য করার চেষ্টা করবো।
নিদ্র ফী টেবিলের উপর রেখে দিয়ে চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। নীলুফার ফী হাতে নিয়ে নিদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন
– একটু সাবধানে থাকবেন। সিজিওফ্রেনিয়ার রোগী তো বলা যায়না কখন কী অঘটন ঘটিয়ে বসেন।
– আচ্ছা।

দুইদিন পর অদ্রিকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নেয়া হলো। অদ্রি আগের থেকেও বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে। সারাক্ষণ তার রুমের এক কোণায় বসে থাকে। নিদ্রের সাথেও আজকাল তেমন একটা কথা বলেনা। সুস্থতাও অদ্রির থেকে ছুটে পালাচ্ছে।
নিদ্র চেষ্টা করে গল্প করার কিন্তু অদ্রি তেমন সাড়া দেয়না। হুম, হ্যাঁ, ঠিকাছে বলেই কাটিয়ে দেয়।
নিদ্র রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে নাজমুল সাহেবের অপেক্ষা করছে। নাজমুল সাহেবের ঢাকা থেকে আজ ফিরে আসার কথা। নিদ্রদের সাথে ফিরে আসার কথা ছিলো কিন্তু কী যেন একটা জরুরি কাজ মনে পড়ায় তিনি থেকে যান।
নিদ্রের বাসায় যেতে ইচ্ছে করছেনা আবার এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকতেও কেমন লাগছে। অদ্রির চেহারার দিকে তাকালে নিদ্র ঠিক থাকতে পারেনা। ওর তখন ইচ্ছা করে সবকিছু শেষ করে দিতে!
দুজনের মাঝে দূরত্বটা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।
ফোনের রিংটোন বেজে উঠাতে নিদ্রের চিন্তায় ছেদ পড়লো। ফোন নাম্বারটা অচেনা। ফোন রিসিভ করে নিদ্র সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো
– কে?
নারী কণ্ঠ ধীরে ধীরে বললো
– আমাকে চিনতে পারছেন না?
নিদ্র বেশ বিরক্তি নিয়ে বললো
– না।
ফোনের ওপাশ থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। হাসতে হাসতেই মেয়েটা বললো
– আপনি এমন কেনো? একটু ভালোভাবে কথা বলা যায়না?
– দেখুন আপনি কে বলুন। চেনা কেউ হলে ভালোভাবে কথা বলবো।
– আমি নীলিমা।
নিদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ভাবতে শুরু করলো এখন কী বলা যায়? এই মেয়ে কেনো তাকে ফোন দিলো? অদ্রির কথাই তাহলে ঠিক।
– কিছু বলবেন?
– আপনাকে খুব মিস করছিলাম। কাউকে খুব বেশি মিস করলে, সেও নাকি তাকে মিস করে? তাই ভাবলাম আপনিও আমাকে মিস করছেন।
– মিস করছিলাম না, আপনার ধারণা ভুল।
– না হতেই পারেনা। আমার ধারণা ভুল না।
নিদ্র কর্কশ কণ্ঠে বললো
– আপনার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র আগ্রহ আমার নেই। আমার স্ত্রী আছে…..
– আপনার স্ত্রী আছে আমি জানি। ওইসব মেয়ের সাথে আপনাকে ঠিক মানায় না। আর সারাজীবন একজন মানুষকে নিয়েই কাটাতে হবে এমন তো না! জীবনটাকে আরেক বার সুযোগ দিয়ে দেখুন না।
আপনার স্ত্রী অনেক অসুস্থ, যেকোনো সময় পাগল হয়ে যাবে বা সুইসাইড করবে। তখন তো ঠিকই আপনাকে অন্যদিকে পা বাড়াতেই হবে। তাহলে সেই পা বাড়ানোটা আমার দিকে হলেই বা সমস্যা কীসের?
– আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে সাজেশন চাচ্ছিনা আপনার কাছে।
– ঠিকাছে সাজেশন দিলাম না। একবার মিট তো করা যায় তাই না?
– না।
– আমি তো আপনাকে পুরোপুরি চাচ্ছিনা শুধু বলছি একটা বার দেখা করি। আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
নীলিমা হাসতে শুরু করলো। অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। নিদ্র অবাক হলো মেয়েটার হাসি তার কাছে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে সারাজীবন ধরে যদি এই হাসি শুনতে পারতো সে, তাহলে মন্দ হতোনা।
নীলিমা হাসি থামিয়ে বললো
– সময়টা বলে দিবেন। দেখা হবে তাহলে সামনাসামনি একদিন। ভালো থাকবেন।

নীলিমা ফোন কেটে দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কপালের টিপটা ঠিক করলো। রূপবতী নারীদের ইগ্নোর করার ক্ষমতা কোনো পুরুষের নেই। আর যে পুরুষের স্ত্রী কুৎসিত তার তো আরো নেই।
পাতলা গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ক্রুর হাসি হেসে ভাবতে লাগলো – এই ঠোঁট দিয়ে কতো সুপুরুষকে পিষে ফেলেছি আর নিদ্র তো কোথাকার ছাই। ওর ভাবখানা আমি পিষে ফেলবো।

নাজমুল সাহেবকে নিয়ে নিদ্র বাসায় ফিরলো। দাদী তার উপর এখনো রেগে আছেন। সত্যিই জীবন টা কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে তার। রুমে যেতে ইচ্ছে করছেনা। এদিকে গোসল না করা অবদি শান্তিও পাচ্ছেনা নিদ্র। অদ্রির ওই চেহারা দেখলেই ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়।
অনিচ্ছাকৃতভাবেই নিদ্র দোতলায় উঠে এলো। দরজা খোলা ছিলো তবে ভেড়ানো ছিলো। দরজা খুলে দেখে নিদ্র অবাক। অদ্রি গাঢ় লাল রঙের শাড়ী পড়ে জানালার ধারে ফ্লোরে বসে আছে। কোনো সাজগোজ নেই, শুধু শাড়ী আর চুল গুলো এলোমেলো হয়ে বুকের উপর ছড়িয়ে আছে।
নিদ্রের ভেতরে হঠাৎ তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো।
দরজা আটকে দিয়ে দ্রুত অদ্রির সামনে গিয়ে হাটু গেড়ে বসলো নিদ্র।
নিদ্রের উপস্তিতি টের পেয়ে অদ্রি হাসার চেষ্টা করলো।
নিদ্র কী বলবে বুঝতে পারছেনা। অদ্রির ডান হাত দুহাতের মধ্যে নিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে তখনই নিদ্রের ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো।
নিদ্র ফোন রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। অদ্রি পলকহীন চোখে নিদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। নিদ্র অস্বস্তি ফিল করছে। ফোন কেটেও দিতে পারছেনা কারণ অদ্রি এতে বেশি সন্দেহ করবে আবার কথাও বলতে পারছেনা। ওপাশ থেকে নীলিমা বললো
– নিদ্র, কথা বলছেন না যে? আমার হাসি শুনতে ভালো লাগছে বুঝি?
অদ্রি স্পষ্ট ভাবে কথাগুলো শুনতে পারছে।
– আমি ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলি।
– আগে বলুন আমরা দেখা করছি কবে?
নিদ্র ফোনটা কেটে দিলো। অদ্রি ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। দুই এক ফোটা পানিও গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
নিদ্র ফোনটা ফ্লোরের উপর রেখে দিলো।
অদ্রি মাথা নিচু করে বললো
– মেয়েটা নীলিমা তাই না?
– হ্যাঁ।
– নীলিমা রূপবতী মেয়ে আবার অবিবাহিতাও। আপনার উচিৎ ওর সাথে কথাবার্তা, ঘোরাঘুরি করে নিজেকে ঠিক রাখা। আমাকে তো পেয়েছেনই কিন্তু শান্ত, স্বস্তি কিছুই পাননি। উল্টো কষ্ট পেতে হচ্ছে।
অদ্রি নিজের শাড়ীর কুচিতে হাত দিয়ে এলোমেলো কুচি দেখিয়ে বললো
– দেখুন না শাড়ীটাও ঠিক মতো পড়তে পারিনা। সাজগোজ তো আরো পারিনা। আর নীলিমা কতো সুন্দর করে শাড়ী পড়ে, সাজগোজ করে! আপনি এখন সঠিক মানুষকে পেয়েছেন। আপনার উচিৎ তার কাছে যাওয়া।
নিদ্র বললো
– আপনার কী হবে?
– আমি তো পাগলই হয়ে গেছি। পাগল নিয়ে কতোদিন থাকবেন। শারীরিক দিক থেকেও আপনাকে সুখ দিতে পারিনা।
আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়াটাই ভালো।
– আপনি সামান্য একটা ফোন কলের জন্য এতো কিছু ভেবে বসে আছেন?
– না। আমি ককয়েকদিন যাবত খেয়াল করছি আমাকে নিয়ে সুখী নন আপনি। আমার থেকে দূরে দূরে থাকেন। আর আমিও আপনার জন্য কিছু করতে পারছিনা। আমার নিজের কাছে অপরাধী লাগে নিজেকে। আমি চাই আপনি সুখী হন। সেটা নীলিমাকে দিয়ে হোক বা অন্য কাউকে আমার সমস্যা নাই।
– আর কিছু বলতে চান?
– ডিভোর্স টা কবে দিবেন?
নিদ্র ভাবলেশহীন ভাবে অদ্রির দিকে তাকিয়ে রইলো।
– আপনার কবে লাগবে?
– আপনার যখন ইচ্ছা হয় বলবেন আমি লয়ারের সাথে যোগাযোগ করবো।

নিদ্র কিছু না বলে ফোনটা হাতে নিয়ে রুম থেকে চলে গেলো। অদ্রি শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করলো!

চলবে…….!

© Maria Kabir

1 COMMENT

  1. golpo ta calo lag6e but pochondo dily kore post kor6en …….
    jani lekhoker anek chinta vabna samai ate bapti hai kintu ki6uta pathaker kothau vabben tarau adhir agrohe apekha kore valo golper tader apekher ki kono mullo neiii…….
    By the way the best for next part……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here