মন ফড়িং ♥ ৭.

0
462
মন ফড়িং ♥ ৭.
মন ফড়িং ♥৭.
মন ফড়িং ♥
৭.
নাজমুল সাহেব নিদ্রের দরজার সামনে পানির বোতল ডান হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বাম হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিচ্ছেন।শব্দের ঊর্ধ্বক্রমে টোকা দিচ্ছেন দরজায়। কিন্তু ছেলের গলার স্বর বা দরজার দিকে এগিয়ে আসার শব্দ পাচ্ছেন না। ইখলাস সাহেব ভাবলেন
– বাম হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে যেরকম শব্দ হচ্ছে, ডান হাতেও কি একই রকম শব্দ হবে? নাকি কম বা বেশি?
তার একসময় মনে হলো একই রকম শব্দ হবে মানে শব্দের তীব্রতা একই হবে আবার মনে হলো না শব্দের তীব্রতা ভিন্ন হবে। প্রমাণ করার লক্ষ্যে পানির বোতল বাম হাতে নিয়ে ডান হাতে দরজায় টোকা দিলেন কয়েকবার।
এবার তীব্রতা পূর্বের তুলনায় বেশি, তবে বেশিটা কতোটা বেশি সেটা ধরতে পারছেন না।
কতোটা বেশি জানার জন্যে আবারো বাম হাত দিয়ে টোকা দিলেন বেশ কয়েকবার। না এবারও তিনি ধরতে পারছেন না।
” একবার না পারিলে, দেখো শত বার ” প্রবাদ বাক্য না কী যেন আজকে তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। না করে তিনি এখান থেকে এক পাও নড়বেন না।
রশীদ সাহেব গভীর চিন্তায় ডুবে থাকেন প্রায়শই। কারণ তার স্ত্রী ভালো করেই জানেন। তারপরও তিনি স্বামীর কাছ থেকে প্রতিদিন শুনতে পছন্দ করেন। এমনকি চিন্তার সমাধানও জানেন এবং প্রতিদিনই বলেন খুব সুন্দর ভাবে গুছিয়ে কিন্তু তার স্বামী মানতে নারাজ। তার কথা, কখনো সে যাবে না।
সকালের নাস্তা দেয়ার সময় রশীদ সাহেবকে বললেন
– এতো কীসের চিন্তা শুনি?
– একটাই তো চিন্তা হোসনের মা। ভাবলাম অনেক বুঝছো?
– তা না হয় বুঝলাম। কী ভাবলে শুনি তো?
– তোমার সমাধানটাই মানতে হবে। তাছাড়া উপায় পাচ্ছিনা। ব্যাংকে যা আছে ওতে খরচ কুলোবে না।
– নাস্তাটা করে বের হয় সেই উদ্দেশ্যে!
রশীদ সাহেব কথার উত্তর না দিয়ে নাস্তায় দেয়া রুটি আর আলু ভাজি খেতে শুরু করলেন।
আর ভাবতে লাগলেন, আজ যদি নাজমুলের মতো ভাগ্য নিয়ে জন্ম নিতাম তাহলে কতোই না সুখী হতাম।
অদ্রির চোখ খুলতে ইচ্ছে করছেনা কিন্তু চোখ না খুলেও শান্তি পাচ্ছেনা।সে এখন কোথায় আছে? তার রুমেই নাকি অন্য কোথাও? তার মন বলছে সে কোনো লাশ কাটা ঘরে পরে আছে। ডোম এখনও আসেনি বিধায় তাকে নিচেই ফেলে রাখা হয়েছে। আর মস্তিষ্ক বলছে, তুই তোর বিছানায় শুয়ে আছিস।নিজের কর্ম দোষে তার এই অবস্থা।
মনের কথা মানবে নাকি মস্তিষ্কের? কে সঠিক বলছে? তার মনের কথা খুব কমই সঠিক হয়েছে। মস্তিষ্ক কখনো কিছু বলেছে কিনা মনে করতে পারছেনা। কখনো বলেনি তাহলে এখন কেনো বলছে?
আসলেই সে লাশ কাটা ঘরে পরে আছে। না তার মস্তিষ্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। মাথার বাম পাশে চিন চিন করে ব্যথা শুরু হয়েছে। কেমন একটা বিশ্রী গন্ধ তার নাকে আসছে। আর আবারও পেট গুলিয়ে আসছে। তার লাশের পাশে সাদা রঙের বড় বড় ইঁদুর গুলো হাঁটছে। লাশকাটা ঘরে নাকি এরকম ইঁদুর থাকাটা স্বাভাবিক। লাশ কেটে কুটে যেটুকু অংশ আশেপাশে পরে থাকে সেটুকু অংশ খেতেই নাকি তারা আসে।
কী আজব তাই না? এই মৃত দেহটাও কিছু ছোটো প্রাণীর আহার জোগায়। কবরে অণুজীব গুলো এই দেহের পচন ঘটাবে। মাটির দেহ মিশে যাবে মাটিতে।
মাথার ব্যথাটা বাড়ছে। আসলেই সে লাশকাটা ঘরে নাকি তার বিছানায় জানতে হবেই। জোড় করে চোখ খোলার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো অদ্রি।
মাথার ব্যথাটা বাড়ছে আরো। সহ্য হবার মতন না।
চোখ খুলে মাথার উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যান টাকে দেখতে পেলো অদ্রি। কেমন যেন আবছায়ার মতো। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের চেনা রুমটাকে দেখে একটু ভালোলাগা কাজ করছে তার মধ্যে। মাথার সেই ব্যথাটা একটু কমেছে।
অদ্রির চোখ খোলা দেখে রীতা বললেন
– ম্যাডাম, খাবার আনবো?
অদ্রি চোখ বন্ধ করে বলল
– রান্না কী করেছেন?
রীতা ধীরে ধীরে বললেন
– আপনি অসুস্থ তাই ফ্যানা ভাত আর কাঁচা কলা ভর্তা করিয়েছি লিলিকে দিয়ে।
এখন আনি?
অদ্রি বলল
– এখন খেতে ইচ্ছে করছেনা।
– আপনি চোখ বুজে থাকবেন আমি চামচে করে খাইয়ে দেই?
অদ্রি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
রশীদ সাহেব বসার রুমে বসে আছেন। রীতা তাকে দেখে সালাম দিলেন৷ রশীদ সাহেব সালামের উত্তর দিলেন।
রীতা মুচকি হেসে বললেন
– আজকে খেতে বলবো না আপনাকে কারণ অসুস্থ মানুষের খাবার রান্না হয়েছে আজকে।
রশীদ সাহেব অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন
-কার কী হয়েছে? অদ্রির কিছু হয়েছে?
– তা না হয়ে উপায় আছে? খাবেন না ঠিক মতো তারপর অসুস্থ হবেন।
– এখন কী অবস্থা? একটু জরুরি কথা ছিলো। কথা বলা যাবে?
– যাবে বৈকি। আপনি বসুন, আমি রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে আসি তারপর একসাথে যাবো।
খাবারের ট্রে বিছানার পাশে ছোটো টেবিলে রেখে অদ্রির গায়ের কাথা ঠিক করে দিয়ে বললেন
– ম্যাডাম রশীদ চাচা আসছেন আপনার সাথে নাকি জরুরি কথা আছে। আসতে বলবো?
অদ্রি চোখ বোজা অবস্থায় বলল
– বলুন।
রশীদ সাহেবকে বিছানার পাশে চেয়ারে বসতে দিয়ে অদ্রিকে খাবার খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রীতা।
রশীদ সাহেব কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বললেন
– মা, এরকম আর কইরো না। নিজের খেয়াল রাখাটা দরকার মা।
অদ্রি মাথা নাড়ালো।
– মা, আমি একটা বড় সমস্যায় পড়েছি। সাহায্য করতে পারবা?
– বলুন।
– আমার ছোটো মেয়েটা প্রেম করেছে এক বড় ঘরের ছেলের সাথে। ছেলে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা জানে। তার কোনো সমস্যা নাই কিন্তু তার পরিবার চায় তাদের বউকে কোনো বড় বাড়ি থেকে তুলে নিবে। আমাদের বাড়িটা তো দেখেছোই। বড় বাড়ি ভাড়া করার মতোন টাকা নাই। যদিও ভাড়া করি তাহলে মেয়েকে সাজিয়ে দিতে পারবোনা। আবার বর পক্ষকে তো হাবিজাবি খাওয়ানো যায়না। তুমি বিরক্ত হচ্ছো না তো?
অদ্রি বলল
– আমার এই বাড়িটা তো খালিই পরে আছে। কয়েকদিনের জন্য আপনারা এখানে আসুন। ছোটো মেয়েটার বিয়েটাই তো?
– জি মা।
– কবে বিয়ে?
– এই সামনের সপ্তাহের পরের সপ্তাহে।
– সমস্যা নাই চাচা। আপনি আর চিন্তা করবেন না। খেয়েছেন দুপুরে?
– জি৷ তুমি খাও মা, আমি আপাতত যাই।
– আচ্ছা।
রশীদ সাহেবের চিন্তা এখন দূর হলো কিছুটা। মেয়েটাকে জামাই এর হাতে তুলে দেয়ার পর পুরোপুরি চিন্তামুক্ত হওয়া যাবে।
চলবে……!
© Maria Kabir