মন ফড়িং ♥ ২.

0
744
মন ফড়িং ♥ ২.
মন ফড়িং ♥২.
মন ফড়িং ♥
২.
সাদামাটা অদ্রির চোখের নেশা তাকে অনেক আগেই পেয়েছে। নেশাগ্রস্ত মন নেশায় ডুব দেয়ার ইচ্ছে আজও পূর্ণ হয়নি তার। প্রায় ৬-৭ মাস কেটে গেছে সে ফিরেছে দেশ থেকে। একটা মূহুর্তে সে অদ্রিকে স্মরণ না করে থাকতে পারেনি। কোনো না কোনোভাবেই মনে পড়বে। এমনও হয়েছে ঘুমের মেডিসিন খেয়ে ঘুমিয়েছে। ঘুমে’র ঘোরেও সেই সাদামাটা অদ্রির অস্পষ্ট ছবি।
নিদ্রের মাঝেমাঝেই মনে হয়, ফিরে গিয়ে তাকে চুরি করে নিয়ে আসতে। পরক্ষণেই মনে হয়, সে কি আসবে তার সাথে?
চিঠির অর্থ তো আরেকটিও হতে পারে। এমনও হতে পারে তার উপকারের প্রতি কৃতজ্ঞতার স্বরূপ চিঠিটা পাঠিয়েছে।
এমনও হতে পারে চিঠিটা অদ্রির নাও হতে পারে।
এতো অস্থিরতা যে তার মাঝে জন্ম নিবে জানা ছিলোনা। জানা থাকলে সেই মানুষকে না নিয়ে ফিরতেন না।
বাবা তাকে কোনোভাবেই বাংলাদেশে যেতে দিবেন না। তারও চালচলনে পরিবর্তন আসছে। নিদ্রের কেনো যেন মনে হচ্ছে আশেপাশের সবাই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সেও পরিবর্তন হচ্ছে। আগে কয়েকটা ডলার বেশির জন্য বেশি সময় কাজ করতো৷ দেশ থেকে ফেরার পর সেই সত্ত্বাটা হারিয়ে গেছে। আজকেও সে বেশ মোটা ডলারের কাজ পেয়েছিলো।  কাজটা ছিলো নতুন দম্পতির ফ্ল্যাট ডেকোরেশান করে দেয়া। ডেকোরেশানও না ফুল, নকশা,রোমান্টিক মূহুর্তের ছবি দিয়ে, আসবাপত্র দিয়ে সাজিয়ে দেয়া।
অন্য কোনো কাজ হলে সে করতো কিন্তু নতুন দম্পতির রোমান্টিক মূহুর্তের ছবি….
রোমান্টিক মূহুর্ত তার আর অদ্রির মাঝে আসছিলো একবার  তাও খুব অল্প সময়ের!
অদ্রির কাছে না যাওয়ার পেছনে আরও একটি কারণ আছে। নিদ্রের মনে হয় অদ্রি তাকে পছন্দই করে না। মনের টান তো দূরে থাক। হয়তোবা তার উপস্থিতি বিরক্ত জাগায় তার মনে। অদ্রির মনে তার স্বামীর স্থান এখনও আছে। সেই স্থানে অন্য কাউকে সে ঠাই দিবে না। আবার মনে হয় চিঠির অর্থ হচ্ছে, তীব্র কাছে পাওয়ার তৃষ্ণা। যেমনটা তার আছে। মরুভূমিতে হেঁটে চলা পথিকের পানির প্রতি যে তীব্র তৃষ্ণা জাগে, ঠিক তার থেকেও বেশি।
তার এই অবস্থার কথা শুনে পিটার হাসতে হাসতে বলেছিলো
– নিড্র ফ্রেন্ড, তুমি শেষ।
হ্যাঁ আমি শেষ, তবে আমার শুরুটা করতে হবে তার কাছে গিয়ে যার কাছে আমার শেষ টা হয়েছে।
হারিয়ে ফেলার ভয়টা ঝেড়ে ফেলতে হবে তাছাড়া নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা দায় হয়ে পড়বে।
নিদ্র চেয়ারে হেলান দিয়ে বিরবির করে বলতে লাগলো
অদ্রি…. অদ্রি….. অদ্রি….
লিলি বসার ঘরে বেশ আয়েস করে বসে বসে মুড়ি খাচ্ছিলো। রান্নাঘরের চিন্তা এখন আর তার করার প্রয়োজন হয়না।আপামনি রান্নার জন্য লোক রেখেছেন। একজন মধ্যবয়সী মহিলা। বয়স কতো হবে? ৪২ – ৪৭? যাইহোক,তার নাম রীতা এবং তিনি সাজগোজে করতে পছন্দ করেন। রান্নাবান্নার কাজ বাদে যেটুকু সময় থাকে সেটুকু সময় তিনি রূপচর্চায় ব্যস্ত থাকেন।আপামনি তাকে কিছুই বলেন না। রীতার রান্না তেমন একটা ভালো না। তবে চা দারুণ বানান। একমাত্র চায়ের কারণেই তাকে রাখা। অদ্রি অবশ্য বলেনি, লিলি নিজেই বুঝতে পেরেছে। রঙিন ভাইজান যে চা পছন্দ করে।
মানুষটা সেই মজার মানুষ ছিলেন। কতো হাসি ঠাট্টা করতেন আর অদ্রি আপা পুরাই নিরামিষ।
রীতা কী রান্না করবে? প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য অদ্রির রুমের দিকে যাচ্ছিলো। যাওয়ার সময় খেয়াল করলেন, লিলি শুধু মুড়ি চাবাচ্ছে। লিলিকে জিজ্ঞেস করলেন
– একটু ডাল এনে দিবো?
লিলি বলল
– না।
রীতা কোনো প্রতিউত্তর না দিয়ে তার কাজে পা বাড়ালেন। লিলি মনে মনে বলল
– যে বাজে ডাল রান্না করে মুখেই নেয়া যায়না।
অদ্রি বিছানায় বসে কাথা শেলাই করছিলো। দরজায় টোকা পরাতে জিজ্ঞেস করল
– কে?
রীতা বললেন
– আমি ম্যাডাম।
– দরজা খোলা আছে।
রীতা ভেতরে এসে বললেন
– আজ কী রান্না করবো দুপুরের জন্য?
অদ্রি কাথায় ফুল তুলতে তুলতে বলল
– লিলিকে জিজ্ঞেস করো। খাবার নিয়ে ও বেশ খুতখুতে স্বভাবের। আমার তো কিছু একটা হলেও চলবে। কিন্তু ওর তো…
– আমার রান্না ওর পছন্দ না।
অদ্রি একটু হেসে বলল
– একজন রাঁধুনি আরেক রাঁধুনির রান্না কখনোই পছন্দ করেনা।
বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিলের দিকে তাকিয়ে রীতা দেখলো, সকালের চা ওভাবেই পরে আছে। ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখেনি। ম্যাডাম প্রায়ই এমন করেন।
রীতা বললেন
– ম্যাডাম গরম এক কাপ চা দিয়ে যাবো?
– হ্যাঁ, যান।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে রীতা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো।
ম্যাডাম এমন কেনো? এর উত্তর তিনি আজও পান নি। লিলিকে জিজ্ঞেস করলে তো কোনো তথ্য জানাই যায়না উল্টো ঝামেলার সৃষ্টি করে।
নাজমুল সাহেব তার মায়ের বিছানার পাশে টুল নিয়ে বসে আছেন। আর তার মা আসমা উল্টো দিকে মুখ দিয়ে আছেন। সে তার ছেলের মুখই দেখতে চান না।
নাজমুল সাহেব বললেন
– আম্মা, আমার দিকে তাকান একটু।
– আমাকে আম্মা বলবিনা। আমি তোর আম্মা না।
– আম্মা প্লিজ প্লিজ
– এই স্টুপিড ইংরেজি ঝাড়িস কেনো কথায় কথায়?
নাজমুল সাহেব মন খারাপ করে বললেন
– আপনি নিজেও তো কেবল ইংলিশ বললেন।
– দেখ আমার সাথে তর্ক করতে আসবিনা।
– আমি সত্যিটা জানালাম।
– না তুই এখনো তর্ক করছিস।
দুই হাত উপরে তুলে মোনাজাতের মতো করে বলল
– ও নাজমুলের বাপ, দেখছো তোমার ছেলে আমার লগে তর্ক করে। আমারই পেটের ছাও আমারে কয় ম্যাও। ও নাজমুলের বাপ।
নাজমুল সাহেব অধৈর্য্য হয়ে বললেন
– আম্মা আপনি এসব কী শুরু করেছেন?
– দেখছো নাজমুলের বাপ, পোলা আমাকে ঝাড়িও দেয়।
নাজমুল সাহেব বিরক্ত হয়ে ওঠে গেলেন।
নিদ্রের কাছে যাওয়া দরকার। এই ছেলেকে দিয়ে আম্মাকে পটাতে হবে।
আচ্ছা একজন সাইকোর ডাক্তার দেখালে কেমন হয়? আম্মার মাথার ভূত তাড়াবে। নাকি তার আম্মার ছেলেমিটাকে মেনে নিবে?
তার চেনা একজন সাইকোর ডাক্তার আছেন কিন্তু আম্মাকে তার কাছে নিয়ে গেলে আম্মা তাকে ঝাটা পেটা করবে। আর তার আবদার পূরণ করতে পারলে আম্মা আনন্দিত হবেন।
কী করবেন? টস করবেন? না, কিন্তু টস করাটা খুব বাজে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে আসলেও তাকে মানতে হবে।
নিদ্রকেই জিজ্ঞেস করা যাক। ছেলেকে এই সময়ে বিরক্ত করবে? নাকি একটু একা থাকতে দিবে? ধুর ছোটোবেলা থেকেই তো সে একাই কাটিয়েছে বেশি সময়। এখন না হয় বাপ তারে একটু জ্বালাক….!
অদ্রি বিরবির করে বলছে
– আচ্ছা নিদ্র, বর্ষাও তো চলে যাচ্ছে আপনি আসবেন না? অপেক্ষার প্রহর গুনে শেষ করতে পারছিনা কিন্তু সময় তো শেষ হয়ে যাচ্ছে…. নিদ্র….
চলবে……!
© Maria Kabir