মন ফড়িং ২৫. 

0
1005
মন ফড়িং ❤
২৫.
নিদ্র নরম সুরে বললো
– তাই বলবা। সমস্যা কই?
নাজমুল সাহেব নিদ্রের ঘাড়ে হাত রেখে বললেন
– সমস্যা হবেনা কারণ মেয়ে তোমার চেহারার প্রেমে পড়েছে।
– বাবা তুমি ভুল।
– না। তোমার চেহারাটাই সুন্দর অন্য কোনো কিছুই সুন্দর না।
– তুমি আমাকে অপমান করছো?
– ভাবতে পারো।
– কী কারণে ডেকেছো? অপমানিত করার জন্য?
– নাহ। আমি চাচ্ছি তুমি বিয়েটা করে ফেলো।
– কাকে করবো?
– এমন ভাবে কথাটা বললে যেন তুমি দুধের শিশু।
– ভাবতে পারো।
– আমি কি তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবো নাকি তোমার দাদী যাবে?
– তোমাদের কারোরই যেতে হবেনা।
– বাংলায় একটা প্রবাদ আছে। ” সত্য কথায় মিঁয়া ব্যাজার।”….
– বাবা সরাসরি বললেই তো পারো, তোমার ছেলে অযোগ্য।
কথাটা বলে নিদ্র নাজমুল সাহেবের রুম থেকে নীরবে বের হয়ে গেলো। নিজের ব্যর্থতা বা অযোগ্যতা শুনতে কারই বা ভালো লাগে। পড়াশোনা করিনি ঠিক আছে তাই বলে অকর্ম না।
অদ্রি আমার চেহারা দেখে ভালোবাসেনি। ভালোবেসেছে…. সত্যিই নিদ্রের জানা নেই কেনো অদ্রি তাকে ভালোবাসে।
সে তো জানে অদ্রিকে কেনো সে ভালোবাসে। তাহলে অদ্রির কাছ থেকে কারণটা জেনে বাবাকে বললেই তো হয়।
অদ্রির রুমের দরজা আপসে রাখা।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে নিদ্র দেখতে পেলো – অদ্রি বিছানার সাথে হেলান দিয়ে ফ্লোরে পা ছড়িয়ে বসে আছে। দরজার দিকে পেছন ফিরে। মাথায় ঘোমটা নামানো। চুল গুলো পিঠে ছড়িয়ে আছে।
বসার ভঙ্গিতে বোঝাই যাচ্ছে অদ্রি উদাসীন হয়ে আছে। নিদ্র দরজায় টোকা দিয়ে বললো
– ভিতরে আসতে পারি?
অদ্রি তাড়াতাড়ি করে ঘোমটা ঠিক করে ঠিকঠাক ভাবে বসে বললো
– হ্যাঁ, আসুন।
অদ্রির সামনে ফ্লোরে বসে নিদ্র বললো
– আপনি আমাকে বিয়ে কর‍তে রাজি হচ্ছেননা কেনো?
– আমি রাজি হয়েছি কিন্তু এই বিয়েটা যাক তারপর করা যাবে।
নিদ্র খাপছাড়া ভাবে বললো
– আমার তো মনে হচ্ছে আপনি আমাকে ঘোরাচ্ছেন।
অদ্রি অবাক হয়ে বললো
– আমি আপনাকে ঘোরাবো কেনো?
– কারণ আমার কোনো যোগ্যতা নেই।
– এখানে যোগ্যতা কোথা থেকে আসছে? নিদ্র কোনো কারণে আপনার মেজাজ বিগড়ে আছে কি?
– আমার তো কোনো যোগ্যতা নেই। তাহলে ভালোবাসেন কেনো আমাকে? আর বিয়ে করতে চাচ্ছেন না কেনো?
– দেখুন সেদিন আপনি নিজেই তো বললেন ভালোবাসতে যোগ্যতা লাগেনা। টিকিয়ে রাখতে যোগ্যতা লাগে।
– আর বিয়ে করতে?
– লাগে।
– আর এই কারণে আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেননা! আমি ঠিক বলিনি?
অদ্রি শান্ত চোখে নিদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলো। নিদ্রের চেহারা ভাবলেশহীন। কী ভাবছে? কেনো ভাবছে? কী কারণে ভাবছে? কিছুই বুঝতে পারছেনা অদ্রি। হঠাৎ করে এমন কী হলো যার জন্য নিদ্র এমন করছে?
আর এই অবস্থায় ওরই বা কী করার আছে?
নিদ্র অল্পকিছুক্ষণ বসে থাকার পর নীরবে চলে গেলো। অদ্রি শুধু তাকিয়ে দেখলো।
আসমা জামান বেশ চিন্তিত। নিদ্র এরকম মেয়ের প্রেমে পড়লো? কী হবে এখন?
এক মেয়ের পাল্লায় পড়ে নাজমুলের জীবন শেষ হয়ে গেলো এবার নিদ্রের পালা। না, এরকম তো হতে দেয়া যাবেনা। আল্লাহ তায়ালা ভাগ্যে রাখলে অন্য ব্যাপার কিন্তু নিজের হিতাহিতজ্ঞান থাকা অবস্থায় এমনটা হতে দেয়া যাবেনা। যেভাবেই হোক এই মেয়ের কাছ থেকে নিদ্রকে সরাতে হবে।
রাতের খাবারের সময় অদ্রি রীতাকে সাহায্য করতে চাচ্ছিলো। রীতা তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রুমে পাঠিয়ে দিলেন। লিলিকে দিয়ে প্রায় কাজ করাচ্ছেন। মেয়েটা খুব চালাক। নিদ্র না কী যেন নাম ছেলেটাকে দেখলে কেমন যেন করে। অঙ্গভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে যায়। মিটিমিটি হাসে। আসমা জামানকে দেখলেই ওর কাজের স্পিড বেড়ে যায়। এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন রীতা। রাতের রান্নার সময় আসমা জামানকে রান্নাঘরের সামনেই চেয়ার পেতে বসিয়ে দিলেন। ব্যস লিলির কাজ করার ক্ষমতা বেড়ে যায়।
মনে হয় এক্সট্রা টাকা পাওয়ার আশায় এমন করে। কিন্তু মেয়েটাকে তার সুবিধার মনে হয়না।
অদ্রি এটাকে তাড়াচ্ছেনা আবার তার সহ্যও হচ্ছেনা।
নিদ্রের পুরো রাত নিদ্রাহীনতায় কেটে গেলো। অদ্রি এক ঘুমে রাত পার করে দিলো।
লিলি সকাল ১০ টার দিকে চা আর বিস্কুটসহ ট্রে নিয়ে নিদ্রের রুমে এসে নিদ্রকে পেলো না। পুরো বাড়ি খুঁজে না পেয়ে আসমা জামানকে জিজ্ঞেস করলো
– ভাইয়াকে রুমে দেখছি না যে?
আসমা জামান বললেন
– আছে আশেপাশে কোথাও। পুরুষ মানুষ সারাদিন বাড়ি বসে থাকবে নাকি?
– নাস্তা নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু পেলাম না।
– সমস্যা নেই। খিদে পেলে একাই চলে আসবে।
– হুম।
– রশীদকে দেখলাম সকালে বসার ঘরে। এখন কোথায়? একটু ডেকে দাও তো কথা আছে ওর সাথে।
– রশীদ চাচা তো আপুর সাথে ব্যাংকে গেছে।
আসমা জামান আর কোনো কথা বললেন না। স্বামীর কাছ থেকে তো ভালোই টাকা পেয়েছে তা না হলে এতো বড় বাড়িতে এতো আরামে আছে কীভাবে?
দেখা যায় খুব নরম কিন্তু ভিতরে শয়তানের অবতার।
নাজমুল সাহেবের ইচ্ছে করছে মরিচ চা খেতে। কিন্তু মেহমান হয়ে রান্নাঘরে যাওয়াটা ভালো দেখায় না। তার উপর সে পুরুষ মানুষ। এদেশে পুরুষদের রান্নাঘরে যাওয়াটা অনেকেই পছন্দ করেননা। বিশেষ করে মফস্বলের লোকজন। রীতাকে বলা যাবে কিনা?
রান্নাঘরের সামনে নাজমুল সাহেবকে বারবার যাওয়া আসা করতে দেখে রীতা তাকে প্রশ্ন করলেন
– কিছু লাগবে?
নাজমুল সাহেব বিব্রত বোধ করলেন। কয়েক সেকেন্ড পর স্বাভাবিক স্বরে বলার চেষ্টা করলেন
– মরিচ চা বানাতে পারেন?
জীবনে প্রথম মরিচ চায়ের নাম শুনলেন রীতা। সরাসরি না বললেন।
– কীভাবে বানায় বলুন। আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি।
নাজমুল সাহেব মরিচ চা বানানোর নিয়ম বললেন।
রীতা মাথা নাড়িয়ে বললেন
– আমি দেখি পারি কিনা।
দুপুর ১২ টায় অদ্রি আর রশিদ সাহেব ফিরলেন। লিলি আশা করছিলো হয়তোবা নিদ্র এসময় এসে পড়বে। কিন্তু না আসছেনা। অদ্রিকে লিলি বাধ্য হয়ে বললো
– রঙিন ভাইজান বাসায় নাই। সেই সকাল থেকে। নাস্তাও করেনি।
অদ্রি ঠান্ডা স্বরে বললো
– আছে হয়তোবা অন্য কোথাও।
– আপনি একটু খুঁজে দেখুন না।
– আহা লিলি, সে বাচ্চা নয় যে এতো খোঁজা লাগবে তাকে। তার যখন সময় হবে চলে আসবে। তুই যা তোর কাজে।
কথাগুলো বলে অদ্রি দ্রুত তার রুমের দিকে চলে গেলো। যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছে কারো কাছ থেকে……
© Maria Kabir

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here