-0.1 C
New York
Saturday, December 7, 2019
Home বড় গল্প ভুল এবং ভালোবাসা পর্ব- ০৬

ভুল এবং ভালোবাসা পর্ব- ০৬

ভুল এবং ভালোবাসা

পর্ব- ০৬
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

একপা দু’পা করে লাবণ্য পৌঁছে যায় কবরস্থানে। কবরস্থানে ক্লান্ত লাবণ্য ঐ জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় যে জায়গায় ওর বাবা- মা আর স্নেহের একমাত্র ছোট্ট ভাইটি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে আছেন।

সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। লাবণ্য তখনো নির্জন জায়গায় বাবা মায়ের কবরের পাশে চুপটি করে বসে ছিল। দু’দিনের অভুক্ত শরীর নিয়ে লাবণ্য বেশীক্ষণ কবরস্থানে বসে থাকতে পারে নি। একটা সময় লাবণ্য জ্ঞান হারায়। সেদিন মাগরিবের নামাজ শেষে মাদ্রাসার কিছু ছাত্র নিয়ে লাবণ্যর চাচা কি কারনে যেন কবরস্থানে গিয়েছিলেন। কবরস্থানে ভাই ভাবির কবরের পাশে একমাত্র ভাতিজিকে নিথর হয়ে পরে থাকতে আঁতকে উঠেন। একটা বিকট চিৎকার দিয়ে ওনি বসে পরেন। রাস্তার আশেপাশের বাড়ির মানুষজন ওনার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন। ছুটে আসেন লাবণ্যর চাচি ও চাচাতো ভাই বোনেরা। লাবণ্যকে ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। পাশেই একটা হসপিটালে রোগী দেখতে বসত লাবণ্যের কাজিন। খবর পেয়ে ছুটে আসে ওর কাজিন। লাবণ্যর পালস চেক করে জানায়, নাহ! কিচ্ছু হয়নি। শুধু জ্ঞান হারিয়েছে। জ্ঞান ফিরার পর লাবণ্যকে সবাই প্রশ্ন করে, কি হয়েছে? লাবণ্য বিছানা থেকে গর্জে উঠে। ও কিছুতেই বিছানায় শুয়ে থাকতে চায় না। লাবণ্য কবরস্থানে বাবা মায়ের সাথে থাকবে বলে স্থির করে। জোর করে ধরেও ওকে কেউ খাওয়াতে পারছে না। অস্থির লাবণ্য হাত পা ছুড়াছুড়ি করা শুরু করে কবরস্থানে যাওয়ার জন্য। অবস্থা বেগতিক দেখে লাবণ্যর চাচা চাচি ফোন করে ঢাকায় লাবণ্যর শ্বশুর বাড়িতে। খবর পেয়ে লাবণ্যর শ্বশুর শাশুড়ি ছুটে আসেন। রাত্রি তখন আড়াইটা। পুরো এলাকা ঘুমিয়ে গেলেও এ বাড়ির কেউ দু’চোখের পাতা এক করতে পারে নি। ওরা ভেবে নিয়েছে লাবণ্য বুঝি পূর্বের ন্যায় পাগল হয়ে গেছে। তাই লাবণ্যর হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে রেখেছে। লাবণ্যর শ্বশুর শাশুড়ি এসে দেখে অসহায় লাবণ্য শিকল পায়ে ছটফট করছে। লাবণ্যর শাশুড়ি লাবণ্যর কাছে ছুটে যান। মাথায় হাত রাখেন। উপরের দিকে মুখ তুলে তাকায় লাবণ্য। শ্বশুর শাশুড়িকে দেখে চোখের জল ছেড়ে দেয় লাবণ্য। শাশুড়ি লাবণ্যকে বুকে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। সকলের নিষেধ অগ্রাহ্য করে লাবণ্যর হাত পায়ের শিকল খুলে দেন ওনি। শিকলবিহীন লাবণ্যকে শাশুড়ি একটি আলাদা রুমে নিয়ে একরকম জোর করে খাবার খাইয়ে দাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দেন। ছোট্ট বাচ্চাদের মত খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পরে লাবণ্য। সকালে ঘুম থেকে উঠলে আবার সেই পাগলামী শুরু হয়- আমি বাবা মায়ের সাথে থাকব, আমি কবরস্থানে থাকব। এলাকার লোকজন কানাঘুষা শুরু করে এবারো বুঝি মাথাটা গেল। লাবণ্যর শ্বশুর সবাইকে ধমক দিয়ে থামায়। তারপর লাবণ্যর কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, মা! কি হয়ছে তোমার? কে তোমায় কি বলছে? তুমি আমাদের বলো। আমরা ওর বিচার করব। লাবণ্য অনর্গল বলতে শুরু করে বিয়ের পর থেকে গতকালের ঘটে যাওয়া কাহিনী পর্যন্ত সব, সব বলে লাবণ্য। পুরো কথা শুনে রেগে যায় লাবণ্যের চাচা চাচিসহ এলাকাবাসী। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় লাবণ্যর শাশুড়ির। লাবণ্যর শ্বশুর বলে উঠে, শুভ্র ভুল করেছে। শুধু ভুল না, ভয়ংকর ভুল। ওর সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ওকে করতে হবে। এখন আমাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে দে মা। আমরা নিজ হাতে তোমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছি। আমরা অনেক বড় ভুল করছি। এখন সেই ভুলের প্রায়শ্চিত করতে চাচ্ছি। মা তুমি আমাদের সাথে চলো। লাবণ্যর চাচা চাচি এমনকি এলাকার কেউ লাবণ্যকে শ্বশুর শাশুড়ির সাথে দিতে চায় না। পরিস্থিতি প্রতিকূলে দেখে শাশুড়ি ছুটে যায় লাবণ্যর কাজিন ডাক্তার সোহেলের কাছে। মায়ের সমতুল্য মহিলার অনুরোধ ফেলতে পারেনি ডাক্তার সোহেল। বাবা মাকে অনেক চেষ্টা করে বুঝিয়ে লাবণ্যকে ওর শ্বশুর শাশুড়ির হাতে তুলে দেওয়া হয়। শর্ত একটাই- যে ছেলের কারনে ওনাদের মেয়ের এই অবস্থা হয়েছে সেই ছেলের ছায়াও যাতে ওনাদের মেয়েকে স্পর্শ না করে। শর্ত মেনে লাবণ্যর শ্বশুর শাশুড়ি লাবণ্যকে নিয়ে ঢাকায় ওদের বাসায় চলে যায়।

কেটে যায় ২বছরেরও অধিক সময়। সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা লাবণ্য এরই মধ্যে লাবণ্য পুনরায় পড়াশুনা শুরু করেছে। অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী এখন লাবণ্য। পড়াশুনার পাশাপাশি একটা ছোট্ট কিন্ডারগার্টেনে বাচ্চাদের পড়া’ই ও। বাকিটা সময় শ্বশুর শাশুড়ির সাথে গল্পে আর আড্ডাবাজিতে কেটে যায়।
সবমিলিয়ে গল্পের নায়িকা লাবণ্য বেশ ভালো ভাবেই ওর দিন কাটাচ্ছে।
এদিকে গল্পের নায়ক শুভ্র…!!!
ওর কি খবর? ও কি আদৌ ভালো আছে????
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের যেতে হবে শুভ্রর কাছে। তো চলুন বন্ধুরা ঘুরে আসা যাক শুভ্রর বাড়ির আঙ্গিনা থেকে।
শুভ্র——————
লাবণ্যকে গ্রামের বাড়িতে দিয়ে আসার পর থেকেই শুভ্র কিরকম উদাসীন হয়ে গেছে। অজানা এক শূন্যতায় শুভ্রর ভিতরটা সবসময় হাহাকার করে। একটা অজানা অপরাধবোধ শুভ্রর ভিতরটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। সারাদিন হসপিটালে থাকত শুভ্র। দিনশেষে হসপিটালের চেম্বার থেকে যখন বাসায় ফিরত তখন কেমন যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করত শুভ্র। বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করে উঠত ওর। যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য প্রতিরাত্রে শুভ্র স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমাতো। কিন্তু কাজ হতো না। মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে যেত শুভ্রর। স্মৃতিরা এসে মনের জানালায় কড়া নাড়ত। শুভ্রর মনে হতো শূন্য রুমে কেউ যেন গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছে। শুধু কাঁদছে না, মাঝে মাঝে অস্ফুট স্বরে কেউ যেন বলছে- আমার খুব কষ্ট হচ্ছে শুভ্র। আমায় একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে।
শুভ্র রুম জুড়ে খু্ঁজে বেড়াতো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেত না ও।
ঠিক সে সময় বুকের বামপাশে চিনচিনে এক ব্যথা অনুভূত হতো।

সেদিন উন্মাদের মত রাস্তায় হাঁটছিল শুভ্র। পিছন থেকে কেউ একজন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় ওকে। রাস্তা থেকে উঠে ডানে তাকাতেই দেখে লাগেজ হাতে শিশির দাঁড়িয়ে। কিছু বলার আগেই শিশির বলে উঠে- ” সারপ্রাইজ দিতে এসেছিলাম। আর সেজন্য বাবা-মা-ভাই-ভাবি কাউকে জানাইনি দেশে ফিরতেছি। কিন্তু এখন তো দেখি সারপ্রাইজ দিতে এসে আমি নিজেই ভয়ংকর রকম সারপ্রাইজ পেয়ে গেলাম।”
ঠোঁটের কোণে শুকনো হাসিরর রেখা টেনে শুভ্র জিজ্ঞেস করে- কেমন আছিস?
প্রশ্নের বদলে প্রশ্ন করে শিশির। আমার’টা না হয় পরেই বলি। আগে বল তুই কেমন আছিস? আর দেবদাসমার্কা চেহারা নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন?
– – – – – – – – – – – – –
কি হলো ভাইয়া? চুপ করে আছিস কেন?
– – – – – – – – – – – – –
আচ্ছা, বাদ দে! ভাবি কেমন আছে সেটা বল……
কি হলো? চুপ করে আছিস কেন?

নিচু কন্ঠে শুভ্রর জবাব, জানি না…….

জোর গলায় শিশির বলে উঠে, কিহ? জানিস না মানে? শুভ্র আবারো বলে, ও আমার কাছে নেই দু’বছর ধরে। তাই বলতে পারব না ও কেমন আছে? ভাইয়ার মুখ থেকে এমন সব কথা শুনে চুপ থাকতে পারে নি শিশির। ও এবার চেঁচিয়ে উঠে- ” ভাইয়া! কি বলছিস এসব? দু’বছর ধরে ভাবি তোর কাছে নেই? তাহলে ভাবি কোথায় আছে?
শান্ত গলায় শুভ্রর জবাব, বাবা মায়ের কাছে রেখে আসছি। খুব সম্ভবত ও বাবা মায়ের সাথেই আছে দু’বছর ধরে।

শিশির এবার আরো জোরে চেঁচিয়ে উঠে।
” What? তুই কি ভাবিকে কবরে ওনার বাবা মায়ের সাথে শুইয়ে দিইয়ে আসছিস?”

শুভ্র:- মানে????

চলবে………..

অনামিকা ইসলাম অন্তরা
অনামিকা ইসলাম অন্তরাhttps://www.facebook.com/anamikaislam.antora.9
" আমিই শুধু রইনু বাকি। যা ছিল তা গেল চলে,রইল যা তা কেবল ফাঁকি।।"

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Lists of writers

Sultana Toma
200 POSTS0 COMMENTS
Maria Kabir
159 POSTS1 COMMENTS
Jubaida Sobti
126 POSTS0 COMMENTS
Rabeya Sultana Nipa
117 POSTS0 COMMENTS
Jannatul Ferdaus
64 POSTS0 COMMENTS
Jannatul Ferdous
48 POSTS1 COMMENTS
মিম
42 POSTS0 COMMENTS
Tabassum Riana
21 POSTS0 COMMENTS
AL Mohammad Sourav
15 POSTS0 COMMENTS
Shahazadi Humasha
12 POSTS0 COMMENTS
Abdullah Al Ador Mamun
11 POSTS0 COMMENTS
Tamanna
10 POSTS0 COMMENTS
Farzana Akter
8 POSTS0 COMMENTS
Umme Nipa
7 POSTS0 COMMENTS
Sadiya Afrin
7 POSTS0 COMMENTS
Nilufar_Nijhum Nijhum
4 POSTS0 COMMENTS
Tamanna Khan
4 POSTS0 COMMENTS
Shahriar Shuvro Sabbir
3 POSTS0 COMMENTS
Maruf Sabbir
3 POSTS0 COMMENTS
Joy Khan
2 POSTS0 COMMENTS

Most Popular

বা‌লিকা বধূ ৫ম পর্বঃ-শেষ পর্ব

বা‌লিকা বধূ ৫ম পর্বঃ-শেষ পর্ব #লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী____) ----------তনয়‌াঃ আজ থে‌কে আমি মুক্ত মা! আয়াত না‌মের...

বা‌লিকা বধূ ৪র্থ পর্বঃ

বা‌লিকা বধূ ৪র্থ পর্বঃ #লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী_____) --------আয়াতঃ প্লিজ তনয়া ব‌লো কি হ‌য়ে‌ছে? প্লিজ-----? তনয়াঃ আয়াত আজ পর্যন্ত...

বা‌লিকা বধূ ৩য় পর্ব

বা‌লিকা বধূ ৩য় পর্ব #লেখ‌াঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী____) ---------তনয়ার ঘুমোন্ত মুখটার দি‌কে তা‌কি‌য়ে দেখ‌তে দেখ‌তে ওখা‌নেই ঘু‌মি‌য়ে...

বা‌লিকা বধূ ২য় পর্বঃ

বা‌লিকা বধূ ২য় পর্বঃ লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী_____) ---------তনয়া ঘুমা‌চ্ছে আর আয়াত তা‌কি‌য়ে আছে তনয়ার...

Latest Posts

More