ভালো থেকো তুমিও

0
1352
-শুনো আমাদের বিয়েতে কিন্তু তুমি সবুজ রঙের শাড়ি পড়বা।একদম কটকটা সবুজ না।হালকা সবুজ রংটা…
>ওমা! বিয়েতে কেউ সবুজ রঙের শাড়ি পড়ে নাকি??
-পড়ে নাই তো কি হয়েছে তুমি পড়বা।আর সবুজ রংটা তোমায় সব থেকে বেশি মানায়…
>হু কচু…পাগল বলবে সবাই…..
-বললে বলবে…লোকের কথা খুব শুন মনে হয় তুমি??
>আচ্ছা বাবা দেখা যাবে নে…
-দেখাদেখির কিচ্ছু নাই..যা বললাম তাই…
>আচ্ছা বাবা ওকে ওকে….
সবুজ শাড়িটা নিয়ে বসে বসে ফেলে আসা  দিনগুলোর কথা ভাবছিল ইলা।দিবা রুমে ঢুকতে ঢুকতেই ইলার দিকে একবার তাকিয়ে বল্ল…
-শাড়ি নিয়ে বসে আছিস কেন?? যা ব্লাউজ  আর পেটিকোট  পড়ে আয়।পার্লারের মেয়েটা চলে এসেছে।
ইলা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বাথরুম  থেকে ব্লাউজ  আর পেটিকোট  পড়ে রুমে আসতেই পার্লারের মেয়েটিকে দেখতে পেল।ইলা আসতেই মেয়েটি ওকে শাড়ি পড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠল….
-আচ্ছা আপু একটা কথা জিজ্ঞেস করি??শাড়ি পড়ানোর এক ফাকে ইলাকে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি…
>হুম..বল..ইলা বল্ল
-বিয়েতে এমন সবুজ শাড়ি নিলেন যে? পছন্দের রঙ বুজি?
>হুম তেমনই…
-তবে আপনাকে না সবুজ শাড়িতে ভালই মানাইছে… কিন্তু লাল কিংবা খয়েরি পড়লে আপনাকে আরো মানাইতো…বিয়েতে কেন জানি লাল শাড়ি না পড়লে বিয়ে বিয়ে লাগে নাহ….! কিছু মনে করেন নাই তো আপু?
>নাহ ঠিক আছে….
-ওই শুনো…
>কি?
-আমাদের বিয়ের সময় দুই হাত ভর্তি করে মেহেদী  দিবা….আর পায়ের মধ্যে অবশ্যই আলতা দিবা….
>আলতা??
-হুম আলতা?
>রাহিদ এখন কেউ বিয়েতে আলতা দেয়??
-কেউ দেয় না দেখেই তো তুমি দিবে…
>কি যে সব বল না তুমি…..
-আপু আপনি পায়ে সুন্দর করে মেহেদি দিলেও কিন্তু পারতেন…আলতা তো এখন বলতে গেলে কেউ দেয় ই না….
পার্লারের মেয়ের কথায় ছেদ পড়ে ইলার ভাবনায়…
-আপু আপনি কি কিছু ভাবছেন??
>নাহ…কিছু না…তুমি ঠিক করে দাও তো আলতাটা…
-আপু কি রাগ করলেন নাকি?
>না রাগ করবো কেন?
-আসলে আপু চুপচাপ থাকতে ভাল লাগে না।তাই আর কি আপনার সাথে একটু কথা বলছি….
খানিকবাদেই দিবা আবার রুমে আসলো…
-কি ব্যাপার? এখনও হয় নি আশা?
পার্লারের মেয়েটিকে বল্ল দিবা…
>হ্যা আপু হয়ে গেছে প্রায়।আর দশ মিনিট  লাগবে….
দিবা আর যায় নি।ঐখানেই রইল।যদিওবা আশা বলেছিল দশ মিনিট  কিন্তু পুরো আধা  ঘন্টা লেগেছিল।আশা চলে যেতেই দিবা ইলাকে বল্ল…
-এইভাবে সাজার থেকে তো না সাজাই উচিত ছিল তোর…বিয়েতে এইভাবে সাজে কেউ? এত হালকা মেকআপ  নেয় কেউ? তোর থেকে বেশি তো আমিই করেছি….
ইলাকে চুপ থাকতে দেখে দিবার রাগটা আরো বেশি বেড়ে গেল।তাই তো দিবা বলতে থাকলো….
-তোরে কিছু বলে লাভ আছে কোন? সেই তো তোর যা মন চায় তাই করবি?? নিজের ইচ্ছা মত কি এক সবুজ রঙের শাড়ি নিয়ে আসছে বিয়েতে পড়ার জন্যে..আবার গ্রামের মেয়েদের মত দুই পায়ে আলতা দিছে…এখন তো বুঝবা না যে আমি কেন এইসব বলতেছি…যখন ঐখানে সবাই এইসব নিয়ে হাসাহাসি করবে না তখন বুঝবা….
ইলাকে কথা গুলো শুনিয়ে দিবা চলে গেল ভিতরে….
-আচ্ছা শুনো…
>আবার কি??
-আমাদের বিয়ে তে না একগাদা  মেকআপ  নিয়ে পেত্নীর মতো সাজতে পারবা না একদম… হালকা মেকআপ  নিবা। চোখ দুইটাতে মোটা করে টেনে আইলাইনার দিবা আর ঠোটে হালকা লাল লিপিস্টিক।তাতেই তোমাকে  যা লাগবে না!
>আরিব্বাস তাই নাকি?
-হুম তাই তো…
>তাইলে একটা কাজ কইরো তুমি আইসা সাজাই দিয়ে যাইও….
-তুমি অনুমতি দিলে সত্যি কিন্তু চলে আসবো…
>রাহিদ…তুমি না…
আয়নার দিকে তাকিয়ে কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই নিজেকে দেখছিল ইলা।সবুজ রঙের শাড়ি…পায়ে লাল আলতা….হালকা মেকআপ…. মোটা করে টানা আইলাইনার আর ঠোটে  হালকা লাল লিপিস্টিক… একদম রাহিদের মনের মত….এমন টাই তো চাইতো ও…
আয়নার থেকে সরে রুমের দরজাটা লক করে ইলা খাটের উপর বসে পড়লো।মোবাইল  ফোনটা হাতে নিয়ে রাহিদের নম্বরটা ডায়াল করতেই ফোন ঢুকার সাথে সাথেই রাহিদ ফোনটা রিসিভ করে নিল।মনে হচ্ছিল হয়তো সে ফোনের অপেক্ষাতেই ছিল….
-হ্যা ইলু…..চিন্তিত  স্বরেই ওপাশ থেকে রাহিদের জবাব পাওয়া গেল….
>কি করছিলে?? ইলা জিজ্ঞেস করে..
-অপেক্ষায় ছিলাম…
>ফোনের??
-হুম…বাসায় এখন??
>হুম…
-ভিডিও কল দেই?? বউয়ের বেশে কেমন লাগছে আমায় দেখাবে না??
>দাও….
রাহিদ ভিডিও কল দিলে ইলা রিসিভ করে।ফোনের ওপাশ থেকে ইলাকে দেখে বেশ খানিকক্ষণ   চুপ করে রইল।রাহিদের নিরবতা দেখে ইলা জিজ্ঞেস করল…
-কেমন লাগছে আমায়?
>মনে রেখেছিলে সব? রাহিদের প্রশ্ন….
-ভুলে যে যাবো না জানতে না বুঝি??
>হুম তাই তো দেখছি….সবুজ শাড়ি…হাতে মেহেদি….পায়ে নিশ্চয়  আলতা দিয়েছো?
-কেমন লাগছে তা তো বললে না?
>যতটা তোমায় কল্পনা করেছিলাম তার থেকেও বেশি সুন্দর লাগছে তোমাকে…
নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলো না ইলা।ফোনটা কেটে দিয়েই কোলের উপর রাখতেই চোখের জমে থাকা অশ্রু গুলো ফোটায় ফোটায় পড়তে থাকলো স্ক্রিনের উপর।রাহিদ আবার অডিও ফোন দিলে চোখের পানি মুছে ইলা ফোনটা রিসিভ করে…
-কাটলে কেন?শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো রাহিদ
>কেটে  গিয়েছিল…
-কাঁদছিলে?
>না তো…
-কথা কিন্তু দিয়েছিলে কাঁদবে  না…এইটুকুও কি রাখবে না??
>হুম….রাখবো…
-যাবে কখন?
>এই তো একটু পর…
-আচ্ছা শুনো…
>কি??
-বলবো না যে ভুলে যাও…শুধু মনে করার চেষ্টাটা করোনা…. আমার ব্যাপারে কিছু জানারও চেষ্টা করোনা…..আমার কথা মনেও বা যদি পড়ে তো একদম কাঁদতে  পারবা নাহ…চোখে পানি যাতে কখনই না আসে….নিজের খেলায় রাখবা….রাগ হলে না খেয়ে থাকবা না একদম….আর….আর ভালো থেকো….
এইটুকু বলেই রাহিদ ফোনটা কেটে দিল।ইলাকে কিছু বলার সুযোগটাই দিল না।ফোন কেটে দেওয়ার এক মিনিট পর ইলা রাহিদ ফোন ব্যাক করে কিন্তু ওপাশ থেকে সংযোগ না আসারই জানান দেওয়া হয়।
এইটাই তো হবার কথা ছিল।কারন রাহিদ তো বলে ছিল যে আজকেই ওদের শেষ কথা হবে।তারপর একেবারের জন্যেই ওদের  মধ্যকার যোগাযোগটা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এমন করে ইলাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রাহিদ সব বন্ধ করে দিবে তা ইলা ভাবে নি……
সেই মানুষ গুলোকে ইলা সব থেকে বেশি অপছন্দ  করতো যারা এক জনের সাথে প্রেম করে শেষমেশ  অন্য একটা ছেলে অথবা মেয়েকে বিয়ে করে নিত।সেই মানুষগুলোকে ভীষণ  স্বার্থপর মনে হত ইলার।একজনকে ভালবেসে অন্য জনের সাথে কিভাবে সংসার করতো তা ইলার মাথায় আসতো না।কিন্তু হায়!ভাগ্য আজ ইলাকে সেই মানুষ  গুলোর দলেরই অন্তর্ভূক্ত  করে দিবে।
রাহিদের সাথে ইলার সম্পর্কটা বছর চারেক হয়ে গিয়েছিল প্রায়।নবীনবরনের অনুষ্ঠানে সবুজ শাড়ি পড়া ইলাকে এক দেখাতে ভাল লেগে গিয়েছিল রাহিদের।আর তারপর ভাললাগাটা সময়ের সাথে সাথে একটা সময় ভালবাসাতেও পরিণতি পেয়ে যায়।খুব ভাল ছিল সবকিছু।একদম ঠিকঠাক। দুই জনের ছোট্ট সংসারের স্বপ্নটাকে সত্যি বানানোর অপেক্ষা ছিল শুধু…..
রাহিদ সবে মাত্র চাকরিটা পেয়েছিল। মাস সাতেক এর মত আর কি।নিজেকে গুছিয়ে নিতে আর কয়টা মাসের অপেক্ষায় ছিল রাহিদ।ইলার ফাইনাল এক্সামটা  শেষ হয়েছিল তিন মাস আগে।ইলার বাবা বরাবরই ইলার পড়াশুনার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস।তাই বিয়ের চাপ নামক ব্যাপারটা কখনই ইলার জীবনে প্রকট আকারে আসে নি।রাহিদও বেশ নিশ্চিন্ত ছিল তার জন্যে।পরীক্ষার কয়েক মাস পর রাহিদ ইলাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে এমনটাই ইচ্ছা ছিল দুই জনের।কিন্তু মানুষ  যেমনটা ভাবে তা কি আর হয়?ভাবনা সরল হলেও জটিলতা ঠিকই চলে তার মাঝখানে…..
পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই ইলা বাসায় তার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে শুনে খানিক অবাকই হয়ে গিয়েছিল।একদিন ইলার বাবা নিজে এসেই ইলাকে জানিয়েছিল তার কথা।ইলার অজান্তেই ফুপাতো ভাইয়ের সাথে ঠিক করে রাখা  বিয়ের কথাটা যখন ইলার বাবা ইলাকে জানিয়েছিল তখন এক নিমিষেই যেন ইলার স্বপ্নগুলো উবে গিয়েছিল।যেমন করে রাহিদের কথা ইলা বলতে চেয়েছিল বাবাকে তা আর হয়ে উঠেনি ।যদিওবা ইলা তখন জানিয়েছিল…  কিন্তু ইলার বাবাও যে তার বোনকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিয়েছিল।আর কোন উপায় না দেখে তাই সব ছেড়ে রাহিদের কাছেই চলে গিয়েছিল ইলা।কারন নিজের ভালবাসার কাছে হেরে যেতে চায় নি ইলা….
ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না ইলার।কিন্তু ঘণ্টা কয়েক পরে যখন বাবার মাইনর হার্ট এট্যাকের কথাটা দিবা আপু ফোন দিয়ে জানিয়েছিল তখন ভালবাসার মায়াকে ছেড়ে বাবার কাছে ঠিকই আসতে হয়েছিল।বাসায় চলে আসার পর বাবার মাথার পাশে অপরাধীর মত যখন বসে ছিল ইলা তখন ইলার বাবা নিচু স্বরে বলেছিল,-“আমাকে ছোট করিস না রে মা!”
বাবার সেই একটা কথাই যেন ইলাকে হারিয়ে দিয়েছিল তার ভালবাসার মায়ার কাছে।জীবন কখনও এভাবে দোটানায় ফেলবে তা ইলার ভাবনাতীত ছিল।ইলা জানে রাহিদের কোন দোষ  ছিল না।কাউকে তো মেনে নিতে হয়,মানিয়ে নিতে হয়… কারো খুশির জন্যে….
দ্বিতীয় বার বাবার কথা ভেবেই সামনে এগুতে পারেনি ইলা।রাহিদ বুঝে ছিল সবটাই।তাইতো ফিরেই যেতে বলেছিল ইলাকে।
ওরা জানে দোষী কেউই না।হয়তো ভাগ্যটাই ওদের জন্যে অনুকুল ছিল না।তাই তো এক বুক কষ্ট নিয়ে ও কাছের মানুষ গুলোর আনন্দের কথা ভেবেই মেনে নিয়েছিল সবটা…
নিজের ভালবাসাকে হারাতে কেউই চায় না।ভালবাসার মানুষটা আঁকড়ে  ধরে বেচে থাকতে চাইলেও অনেক সময় ভাগ্য হয়তো  স্বার্থপরের মত তা আর হতে দেয় না।ভালবাসা হারানোর গল্পের মধ্যেও নিহিত থাকে অন্য কারো ভাললাগা,ভালথাকা।আর কিছু ভালবাসা হয়তো সারাজীবনই অসম্পূর্ণ থেকে যায়…
-ইলু!ইলু! এই ইলু!দরজা লক করে রাখছিস কেন?
দরজার ওপাশ থেকে দিবার ডাক শুনে জমে থাকা অশ্রুজলের শেষ চিহ্নটা মুছে  দরজাটা খুলে দিল ইলা…
-কি রে? হইছে টা কি? তুই দরজা লাগাই রাখছিস কেন??উদ্বিগ্ন স্বরে ইলাকে জিজ্ঞেস করল দিবা..
>কিছু না… এমনি…
-কিছু না মানে? আর এই…কি করছিস তুই চেহারার??তুই কি কান্না করছিস??
>না…
-দেখ ইলু কেউ তো জোর করে তোর বিয়েটা দিচ্ছে না তাই না? তাহলে কেন এখন এইসব করতেছিস??
>আপু প্লিজ  বেশি বুঝা বাদ দাও….কি করতে হবে এখন বল…
দিবা কিছুক্ষন চুপ থেকে বল্ল…
-নিচে চল..গাড়ি চলে আসছে…
শেষ বারের মত আবার একটু টাচ আপ দিয়ে ইলা নিচে নেমে গাড়িতে গিয়ে বসল..গাড়ি চলতে শুরু করেছে কমিউনিটি সেন্টারের উদ্দেশ্যে।নিজের ইচ্ছাতেই ইলা সব মেনে নিয়েছে।কিন্তু কেন মেনে নিয়েছে তা ইলা আর রাহিদই ভালো জানে।তা কি আর কেউ জানতে চায়? ইলা জানে এই শেষ মুহুর্তেও কেউ এসে আর ওকে বলবে না যে,আচ্ছা থাক বিয়েটা করতে হবে না….কিংবা বাবাও এসে বলবে না যে,থাক মা আমি ছোট হবো না…তুই তোর ভালবাসার কাছে ফিরে যা….কারন এইটাই যে বাস্তবতা….!
আর কিছু সময় পরই বদলে যাবে ইলার জীবনের গল্পটা…ইলার জানা সে কেমন থাকবে বাকিটক জীবন।তবে সবাই ভাল থাকলে ইলাও একদিন মানিয়ে নিবে বাস্তবতার খাতিরে….।
.
Writer by: Shuk Tara

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here