বসের সাথে প্রেম পর্ব-৩২

বসের সাথে প্রেম
পর্ব-৩২

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

অতঃপর সে বৃষ্টিমুখর রাত্রে অনেক কিছু’ই হয়ে গিয়েছিল।

পরদিন সকালে সিয়াম মায়াকে নিয়ে বাসায় যায়। মায়া বাসায় গেলে আবির ও আবিরের ফ্যামিলিসহ মায়ার মামার বাড়ি থেকে সবাই আসে। মায়াকে ওর মামা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে মায়া-সিয়ামের আবার নতুন করে বিয়ে দেওয়া হয়। ওদের বাসর ঘর’টা মায়ার মামাত বোন জয়া নিজ হাতে সাজায়। সে রাত্রে সিয়াম-মায়া নতুন করে ওদের বৈবাহিক জীবন শুরু করে। ছোট্ট বাবা পাগল মণি’কে কৌশল করে বিজয় ওর কাছে নিয়ে যায় সিয়াম-মায়া যাতে একান্তে কিছুদিন সময় কাটাতে পারে সে জন্য।

এদিকে দায়িত্ব নিয়ে মণি’কে নিয়ে যাওয়ার পর আরেক’টা ঝামেলায় পরে বিজয়। সকালে চেম্বারে গিয়ে ফিরতে হতো সন্ধ্যায়। কিছু’তেই যেন মণিকে সময় দিয়ে পেরে উঠছিল না বিজয়। যার কারনে মণি প্রায় অভিমান করত মামার সাথে। সেদিন চেম্বার থেকে ফিরে মণির রুম থেকে বিকট হাসির আওয়াজ পায় বিজয়। কেন জানি মনে হলো রুমে মণির সাথে এ বাড়ির কোনো কাজের মেয়ে নই, অন্য কেউ আছে। বিজয় দৌঁড়ে রুমে যায় কিন্তু কাউকে পেল না। মণিকে জিজ্ঞেস করলে বলে-
কোথায়? কেউ নেই তো…
মামা তুমি ভুল শুনছো।
বিজয় মনের ভুল ভেবে চিন্তা’টা উড়িয়ে দেয় মাথা থেকে। কিন্তু পর পর কয়েক দিন ধরে’ই যখন লক্ষ্য মণি কার সাথে যেন হাসে-খেলে, আর বিজয় নিজেও দেখছে ওর রুম’টা কেমন যেন সুন্দর করে গোছানো তখন বিজয়ের সন্দেহ বাড়ে।
কিন্তু কাউকে ধরতে পারে না।

সেদিন চেম্বার থেকে ফিরে বিজয় ওর রুমে গেলে কেমন যেন চেনা গন্ধ অনুভব করে। এই গন্ধ’টা বিজয় এর আগেও বহুবার পেয়েছে। খুব চেনা গন্ধ। কিন্তু সেই গন্ধ’টা কোথা থেকে আসে বিজয় জানে না। পরদিন রাত্রে__
বিজয় একটু তাড়াহুড়ো করে’ই বাড়ি ফিরে। এতটা তাড়াহুড়ো যা কখনো আগে হয়নি। বিজয় ওর রুমের ভেতর যাওয়ার পর আবারো সেই চেনা গন্ধ পায় যেটা বিগত ৫বছর ধরে পেয়ে আসছে। বিজয় টাই খুলতে খুলতে বারান্দায় যায়। হঠাৎ’ই মনে হলো পিছন থেকে কেউ যেন সরে গেছে। বিজয় টাই খুলা রেখে দৌঁড়ে যায় রুমের বাহিরে। কিন্তু নাহ।
কোথাও নেই।
সেদিনও মনের ভুল ভেবে বিষয়’টাকে এড়িয়ে যায় বিজয়। পরদিন সকালে চেম্বারে গিয়ে বিশেষ প্রয়োজনে চেম্বার থেকে ফিরে আসে বিজয়। সেদিন গোসল খানায় ঢুকলে একটা নূপুর পায় বিজয়। নূপুর’টা হাতে নিয়ে বিজয় যেন চমকে যায়। এটা পেত্নী তেত্নীর নূপুর নয়তো????
হতেও পারে।
কারন- এখানে এই গোসলখানায় পেত্নী ছাড়া ২য় কোনো মেয়ে আসতেই পারে না।

যায় হোক নূপুর’টা হাতে নিয়ে বিজয় কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করল। তারপর ভাবতে লাগল__
” এটা এই বাসার কোনো কাজের মহিলা/মেয়ের নইতো?”
ব্যাপারটা জেনে যার নূপুর তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। সেদিন দুপুরে কাজের মহিলারা আসলে বিজয় জানতে পারে ওরা কেউ নূপুর পরে না।
বিজয় যেন সপ্ত আকাশ থেকে পরল। তাহলে কি পেত্নী???? ???
যায় হোক….

পরদিন সকালে সিয়াম-মায়া এসে মণিকে নিয়ে যায়।
যাওয়ার আগে মণি যেন বার বার কিছু একটা বলতে চাইছিল বিজয়কে যেটা এখন টের পায় বিজয়। আচ্ছা, মণি আমায় কি বলবে?
আর ও কেন যেতে চাইনি সিয়াম-মায়ার সাথে?
আর কেন’ই বা যাওয়ার সময় বার বার আমার রুমের দিকে তাকাচ্ছিল?
আর কেন’ই বা বলে গেল ভালো থেকো সবাই???
এখানে তো আমি ছাড়া কেউ ছিলাম না?
মণি কি বুঝাতে চাচ্ছিল???
ব্যাপারটা সত্যি’ই রহস্যজনক।

আর সেই রহস্য উন্মোচন করার সময় এবং সুযোগ কোনো’টাই হয়ে উঠেনি বিজয়ের। তার আগে’ই অসুস্থ হয়ে গেল সে। সে রাতে প্রচন্ড জ্বরে কাঁপছিল বিজয়। শেষ রাত্রে হঠাৎ করে শরীরে উষ্ন পরশ অনুভব করে সে। মনে হচ্ছে কেউ শরীরে কম্বল/কাথা টেনে দিয়েছে। জ্বরের ঘোরের মধ্যেও বিজয় টের পায় রুমে কারো উপস্থিতি। সেই চেনা গন্ধ…..
মনে হচ্ছে কেউ একজন কপালে আলতো করে চুমু দিচ্ছে। বিজয় চোখ মেলে তাকাই। একটা অস্পর্শ মানবি ওর পাশ থেকে সরে যাচ্ছিল। যাওয়ার সময় বিজয় হাত’টা ধরে ফেলে।
বেড সুইচ’টা জ্বালিয়ে বিজয় হতবাক। এ যে মায়ার মামাতো বোন….

বিজয়ের জ্বর যেন মুহূর্তে’ই সেরে গেছে। ওর সারা শরীর ঘামছে। কিছু’তেই বুঝে উঠতে পারছে না এ মেয়ে এখানে কেন?

– জয়া আপনি?
আপনি এখানে? এত রাত্রে???(বিজয়)
__……. (নিশ্চুপ জয়া)
__ কি হলো? কথা বলুন?
আর আপনার এই অবস্থা কেন? চোখ এমন লাল কেন? আর কোথা থেকে আসছেন এত রাত্রে???(বিজয়)
__ জয়া তখনো নিশ্চুপ।
__ কি হলো? কথা বলুন..(বিজয়)
_ জয়া কাঁপতেছে। আর আমতা আমতা করতেছে। বিজয় কড়া গলায় বলল,
কি হলো? কিছু’তো বলুন। জয়া বলার মতো কোনো ভাষায় যেন খুঁজে পাচ্ছে না। কি বলবে সে???
কি করে সত্যি’টা বলবে।
কি করে বলবে, আমি আপনার এখানে দীর্ঘ ৫মাস’টা বছর ধরে’ই আছি। আপনার ঋন শোধ করার জন্য কাজের মেয়ের বেশে আছি। আপনার টাকাতে আমার মায়ের জীবন বাঁচলো, সেই কৃতজ্ঞতা থেকে আছি। আর চেষ্টা করছি আপনার ঋন পরিশোধ করার। আর সেই সুবাধে আপনাকে রান্না করে খাওয়াতেও পারছি, পারছি আপনার অসুস্থতার সেবা করতে…

কি হলো? কিছুতো বলেন? আপনি এখানে কেন???(বিজয়)
__ আপনার জ্বর এসেছিল তাই….কাঁপা কাঁপা গলায় জয়া জবাব দিল।
__ আমার জ্বর আসছে আপনি কিভাবে জানলেন? আর কিভাবে এখানে আসলেন?(বিজয়)

– জয়া মনে মনে বলছে_
আমি আপনাকে ভালোবাসি ডাক্তার বিজয়, আমি আপনাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি। আর তাই আপনি কখন কি করেন, সেটা সব খবর আমার নিতে হয়।

_ বিজয় এবার বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। একের পর এক প্রশ্নে জয়া যেন আর পেরে উঠতে পারছিল না। পারছিল না চুপ থাকতে। যার কারনে মিথ্যে বলতে’ই হলো_
” আমি এসেছিলাম মণি’কে দেখতে। এসে দেখি ও নেই। জার্নি করে এসেছিলাম তো, যার কারনে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। ঘুম ভাঙ্গে মাঝ রাত্রে। কিন্তু আমি ভাবছি কেবলি রাত হয়েছে। তাই আপনার সাথে দেখা করার জন্য এসেছিলাম।”

– ওহ!
খেয়েছেন???
আর চোখগুলো এত লাল কেন? সত্যি’ই কি ঘুমাইছিলেন নাকি অন্য কিছু?????(বিজয়)

– কেবল’ই ঘুম থেকে উঠলাম,তাই লাল হয়ে আছে।(জয়া)
_ আর খাওয়া!!!
হয়েছে??? (বিজয়)

জয়া নিশ্চুপ…
– ওহ!
খান নি তো???(বিজয়)
– আসলে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।(জয়া)
_ বুঝলাম।
এখন খাওয়ার চিন্তা ভাবনা আছে???(বিজয়)
– আমার ক্ষুদা নেই। (জয়া)
– ঠিক আছে।
আপনি গিয়ে ঘুমান তাহলে।(বিজয়)

জয়া চলে যাচ্ছিল, কি যেন মনে করে ফিরে আসল।
বিজয় জয়ার দিকে তাকিয়ে বলল__
” কিছু বলবেন?”

– আপনার জ্বর কমেছে?(জয়া)
বিজয় কপালে হাত দিয়ে বলল__
হ্যাঁ, জ্বর সেরেছে।
আর যা করছেন তা সেরে তো উপায় নেই।(হাসতে হাসতে বিজয়)
_ জি??? কি করলাম?(জয়া)
__ করছেন আর কি!
মাঝরাত্রে ভেলকি দেখালেন। এই আর কি…!!!(বিজয়)
_….. (জয়া)
— আচ্ছা, যান।
ঘুমান গিয়ে…..(বিজয়)

জয়া চলে গেল।
পরদিন সকাল বেলা জয়া বিজয়ের কাছে গিয়ে এ বাসায় ভাড়া থাকার অনুমতি চাই। নিকটভর্তি কোনো কলেজে চাকরী হয়েছে,যার জন্য কারনে এখানে থাকতে হবে। এই অজুহাত দেখিয়ে বিজয়ের কাছে সে বাসায় থাকার অনুমতি চেয়ে নেয়। বিজয়ও সাত-পাঁচ না ভেবে রাজি হয়ে যায়। জয়াকে বলে দেয় এ বাসায় থাকতে, তবে ভাড়াটিয়া হিসেবে নয়, কুটুম হিসেবে।
জয়া কোনো ছদ্মবেশ ছাড়া’ই অবাধে এ বাসায় ঘুরাফেরা করতে পারবে, ভাবতে’ই আনন্দে ওর মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।

দেখতে দেখতে একটা বছর চলে গেছে।
বিয়ে নিয়ে বিজয়ের কোনো চিন্তা-ভাবনা ছিল না, কিন্তু একমাত্র চাচার পিড়াপিড়ি’তে বিজয় রাজি হয়। চাচাকে বিয়ে করবে বলে জানায়। চাচা মায়াকে খবর দেয়। মায়া আসলে মায়াকে বলে বিজয়ের হসপিটালে’ই ডাক্তার নুসরাতের সাথে দেখা। ডাক্তার নুসরাত ওনার ভালো লেগেছে, ঐ মেয়েকে দেখার জন্য পাঠালো বিজয়ের চাচা। পরিবারের সাথে আগে’ই কথা বলে রেখেছে। মায়া গিয়ে নুসরাতকে দেখে আসে। দেখতে শুনতে ভিষণ লক্ষ্মী মেয়ে নুসরাত। যাকে পছন্দ না করে উপায়’ই নেই।
মায়া বাসায় এসে বোন হিসেবে ওর সম্মতি জানালে বিজয়ের আর কিছু’ই বলার থাকে না। চাচার সাথে আলহামদুলিল্লাহ বলে রাজি হয়ে যায় বিজয়।
বিজয়ের চাচা বিজয়ের বিয়েটা সামনে মাসে’ই হবে বলে জানিয়ে দেয়। যদিও একটু বেশীই তাড়া মনে হচ্ছিল তবুও চাচার অসুস্থ শরীরের কথা চিন্তা করে সেটাই মেনে নেয় বিজয়।
এই মাসের ১৫তারিখ চলতেছে। সামনে মাসে বিয়ে হলে হাতে আছে মাত্র ১৫দিন। এর ভিতরে সব করতে হবে। আর কেনাকাটার ব্যাপার’টা বিজয় মায়া এবং সাইমার উপর দিয়ে দিয়েছে।

অবশ্য জয়াকে বলছিল,কিন্তু জয়ার কলেজে সময় দিতে হয় তাই ও কেনাকাটা’ই থাকতে পারবে না বলল।
দেখতে দেখতে ঘনিয়ে আসে বিয়ের দিন। সেদিন জয়ার কাছে মণিকে রেখে মায়া সাইমাকে নিয়ে শপিংয়ে যায়। তারপরের কথোপকথনের কথা সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরলাম এখানে_
মণি:- খালামণি!
তুমি বউ হবে না? ও খালামণি বলো না…
জয়া:-…….
মণি:- খালামণি!
তুমি না বলছ তুমি বউ হবে। বিজয় মামার বউ হবে???
জয়া:- মণি, মামণি!
প্লিজ চুপ করো। কেউ শুনবে তো….
মণি:- কেন চুপ করব?
আমি কি মিথ্যে বলছি নাকি? তুমি তো বিজয় মামার ঘর লুকিয়ে গুছিয়ে আসতে, লুকিয়ে মামার জন্য রান্না করতে। লুকিয়ে মামাকে দেখতে। তাহলে বিয়েটা করছ না কেন???
বিয়ে না করলে এসব করছ কেন???
জয়া:- ওরে আমার পাকনা বুড়ি! এত কথা বলেরে…
তোমার মামা আমার বন্ধু। তাই এসব করতাম…
মণি:- বন্ধুকে বুঝি লুকিয়ে দেখতে হয়? বন্ধুর বিয়ে হলে বুঝি মানুষ কাঁদে???
জয়া:- মণি মা!
আমার মাথা’টা একটু ব্যথা করতেছে। একটু টিপে দিবে?
মণি:- ঠিক আছে, এখন ছেড়ে দিলাম। চুপ করে শুয়ে থাকো। তবে হ্যাঁ…
মামাকে বিয়ে করোনি কেন সেটা কিন্তু আমায় বলতে হবে….

জয়া আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপ করে শুয়ে পরল চোখ বোজে। মণি ছোট্ট ছোট্ট হাতে মাথা টিপে দিচ্ছে। মাথা টিপতে টিপতে’ই জয়া ঘুমিয়ে পরে। ঘুম ভাঙে মায়ার ডাকে।
জয়া ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলিয়ে মায়ার দিকে তাকালো। তারপর__
” তুই? কখন এলি?!!”
_ এইতো, এলাম। মণি কই???(মায়া)
__ কই? এখানে’ই তো ছিল।(জয়া)
__ এখানে ছিল, নাহ???
তোমাকে দিয়ে গেছি ওকে খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর জন্য আর তুমি কি না ওকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছ।(মায়া)
_ মায়া!
কি বলছিস তুই এসব?
ও তো রুমে’ই ছিল…(জয়া)
__ রুমে ছিল, তাহলে রাস্তায় গেল ক্যামনে?(মায়া)
__ কই? মণি কই???
ওকে আনতো….(জয়া)
_ বিজয়ের সাথে ওর রুমে আছে। যা তুই। আমি ফ্রেশ হচ্ছি….(মায়া)
_ আচ্ছা…. (জয়া)

কিছুক্ষণ পর জয়া বিজয়ের রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মণির নজরে পরে সেটা। খালামণি, খালামণি করে দৌঁড়ে যায় জয়ার কাছে। আঙ্গুল ধরে টেনে এনে বিজয়ের পাশে বসায়। তারপর__
মণি:- আচ্ছা, মামা!
তোমাকে কি আমি কয়’টা কথা বলতে পারি???
বিজয়:- বলো মামণি…
মণি:- বন্ধু মানে কি???
জয়া:- মণি মামণি! তোমরা গল্প করো, আমি চা করে নিয়ে আসছি….
মণি:- ঠিক আছে….

বিজয়:- হুম, মামণি এবার বলো….
মণি:- বন্ধু মানে কি???

বিজয় মণিকে কোলে টেনে নিয়ে বলল__
বন্ধু মানে হলো দুঃখের সাথী, তোমার বিপদে-আপদে যে সবসময় তোমার পাশে ছায়ার মত থাকে সেই বন্ধু। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন বলো তো???
মণি:- বলছি…
আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও….
বিজয়:- আচ্ছা, ঠিক আছে বলো।
মণি:- আচ্ছা, মামা!
বন্ধুদের জন্য কি মানুষ কাঁদে?
বিজয়:- হুম, বন্ধুর বিপদে কাঁদে। বন্ধুর কষ্টে কাঁদে।
মণি:- আর বন্ধুর বিয়ের কথা শুনেও কাঁদে???

মণির প্রশ্নের ধরন দেখে বিজয় এবার অবাক হয়ে যায়। অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে__
” বিয়ে? সে তো খুশির খবর। কাঁদবে কেন?”
মণি:- তার মানে কাঁদে না, তাই তো?
বিজয়:- হুম…

মণি গালে হাত দিয়ে গুনগুনিয়ে বলতে লাগল,
তাহলে খালামণি কেন কাঁদল? ওনিও তো মামার বন্ধু….

বিজয়:- কি হলো মামণি???
মণি:- তবে ঐ খালামণি’টা কাঁদলো কেন???
বিজয়:- কোন খালামণি???
মণি:- সে তুমি চিনবা না…
বিজয়:- আচ্ছা, তোমার খালামণির বন্ধু কি ছেলে???
মণি:- হুম…
বিজয়:- তোমার খালামণির বন্ধুর অন্য জায়গায় কি বিয়ে ঠিক হয়ছে??
মণি:- হুম।
বিজয়:- বুঝলাম।
মণি:- কি বুঝলা মামা???
বিজয়:- তোমার খালামণি ওনার বন্ধুকে ভালোবাসে। তাই কাঁদতেছে।
মণি:- ভালোবাসা কি মামা???

ঠিক তখন’ই জয়া চা হাতে রুমে প্রবেশ করে।
বিজয়ের দিকে চা’য়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বলে__
” চা….”
আপনিও বসেন….(বিজয়)
_ আমি বৃষ্টির দিন ছাড়া চা খাই না।(জয়া)
_ বৃষ্টির দিন কেন?(বিজয়)
___ ভালো লাগে, তাই।(জয়া)
__ আপনার রুচি আছে বটে..(বিজয়)
_ আপনি খা’ন। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।(জয়া)

এই বলে জয়া মণিকে নিয়ে চলে যায় রুম থেকে। বিজয় চা খাচ্ছে আর মনে মনে বলছে__
” আমি বৃষ্টির দিন ছাড়া চা খাই না…”
ইস! কি মিষ্টি করে কথা বলেরে মেয়েটা….

গায়ে হলুদের দিনের বলছি। সবাই যখন বিজয়কে হলুদ দিতে ব্যস্ত, মণি তখন চুপিচুপি লুকিয়ে-চুরিয়ে সাইমার ছেলে সাইমকে নিয়ে পৌঁছে গেল ডাক্তার নুসরাতের বাসায়। পাশাপাশি বাসা হওয়ায় খুঁজতে বেগ পেতে হলো না বাচ্চা দুটির। পৌঁছে গেল নুসরাতের বাসায়। গেইট খোলা ছিল বিধায় অতি সহজেই খোলা গেইট দিয়ে উপরে চলে গেল সাইম-মণি। ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলে ওদের দেখে অবাক হলো সবাই। পরে বুঝতে পারল হয়তো ঐ বাসা থেকে মেয়েরা আসছে হলুদ দিতে, বাচ্চা দুইটা বোধ হয় আগেই চলে আসছে। নুসরাত সিড়ির উপরেই দাঁড়িয়ে ছিল। বাচ্চা দুইটাকে দেখে নিচে নামল। ওদের নিয়ে উপরে চলে গেল।

মণি’ই প্রথমে কথা শুরু করল।
মণি:- ভালো আন্টি…
আপনাকে একটা কথা বলব?
নুসরাত:- জি, বলো….

মণি জয়ার ব্যাপারে সব’টা বলল। সব’টা শুনার পর ওর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছিল। কি বলছে ওরা এসব? আর জয়ার ফোনে বিজয়ের এত্তগুলো ছবি।তার মানে বাচ্চারা যা বলছে একটু হলেও সত্যি। জয়া বলে মেয়েটা বিজয়কে ভালোবাসে। ভিষণ ভালোবাসে।
নুসরাত মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিল।
নুসরাত!
একি করতে যাচ্ছিলে তুই?
না জেনে শুনে হুট করে বিয়ে করে একটা মেয়ের তিলতিল করে গড়া স্বপ্নকে ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছিলে তুই। তুই এতটা খারাপ?
ছি! নুসরাত।
ছি…..
মনে মনে নিজেকে নিজেই ধিক্কার দিল নুসরাত।
এদিকে মণি কেঁদে’ই চলছে।
নুসরাত মণিকে কোলে নিয়ে বলল__
” কেঁদো না মা! আমি থাকতে কিচ্ছু হবে না। আমি সব ঠিক করে দিব। তোমার মামা আমাকে নয়, তোমার জয়া খালামণি’কে বিয়ে করবে।”

মণি একটু শান্ত হলো এ কথা শুনে….

নুসরাত বাড়ির ড্রাইভারকে দিয়ে সাইম-মণিকে পাঠিয়ে দিয়ে বিজয়কে ফোন করে আনলো। বিজয় আসলে সব’টা খুলে বলে নুসরাত। বিজয় যেন আকাশ থেকে পরল। স্তব্ধ হয়ে গেছিল কিছুক্ষণের জন্য। তারপর নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল__
” নুসরাত! এরা বাচ্চা মানুষ। এরা ভালোবাসার কি বুঝে? এরা হয়ত না বুঝে’ই এসব বলছে।”

নুসরাত শক্ত গলায় বলল__
” বিজয়! বাচ্চারা কখনো মিথ্যে বলে না। আর এই দেখো জয়ার ফোন। তোমার অগোচরে এই ছবিগুলো ও তুলছিল। ওর সমস্ত গ্যালারী খুঁজে দেখো, কেউ আছে? না নেই। তার মানে কি? ও কেন এসব ছবি রাখতে যাবে? কেন রেখে দিবে যতনে??? বিজয়…
ওর নোটপ্যাডের সেভ করা একটা লিখাগুলো দেখো। ৬বছর আগেকার লেখা এটা। যাতে লিখা__
ওনার ঋন কখনো শোধ করা যাবে না। আবার পরিশোধ করাও যাবে না। কারন, আমরা খুব’ই নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন। একসাথে ৫লক্ষ টাকা পরিশোধ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু পারছিলামও নিরবে ওনার দান মেনে নিতে। আর তাইতো আজ চলে আসলাম ওনার বাসায় কাজের মেয়ের ছদ্মবেশে।
বিজয়…
দেখো। তুমি তো এই মেয়ের মায়ের চিকিৎসার জন্য’ই টাকা দিয়েছিলা, তাই না?
ও তার’ই ঋন পরিশোধ করতে এসেছিল। বিজয়! ও ছায়ার মত ৫টা বছর তোমার পাশে থেকেছে। গত বছরে যখন ধরা পরল তখন মিথ্যে কলেজের অজুহাতে তোমায় বাসায় থাকার অনুমতি চেয়েছিল। বিজয় দেখো…
এখানে কি লিখা…
এখানে লিখা ও একটা হসপিটালে জব করে। আর সেটা শুধুমাত্র তোমাকে দেখার জন্য’ই করে। তার মানে কি বিজয়? ও তোমাকে ভালোবাসে। ভিষণ ভালোবাসে। বিজয় এতেও যদি তোমার বিশ্বাস না হয় তাহলে তুমি ২য় কাজের মেয়েকে ফোন করে এখানে আসতে বলো। আমার মনে হয় ঐ মেয়েটি সব জানতো। বিজয় নুসরাতের কথা মতো কল দিল ২য় কাজের মেয়েকে। মেয়েটি এসে প্রথমে কাঁপতে লাগল, তারপর বলল__
” স্যার আমায় মাফ করে দেন। জয়া বলে মেয়েটা ছয় বছর আগেই এখানে আসে। ও ওর মায়ের ঋন পরিশোধ করতে চেয়েছিল, তাই রোজিনাকে সরিয়ে রোজিনার জায়গায় ঐ মেয়েকে দিয়েছিলাম। ওনি’ই রান্না বান্না করত, আর যা টাকা পেত সব দান করে দিত আপনার নামে। ও আপনার রুম গুছাতো। আর ঐ নূপুরটাও জয়া মেয়েটার। ও মানা করছিল, তাই বলিনি। স্যার, আমায় মাফ করে দিন। ঐ মেয়ে চলে যাচ্ছে আজকে। আর এমন ভুল হবে না। স্যার, আমায় তাড়িয়ে দিবেন না।

__ নুসরাত কাজের মেয়েকে বাসায় পাঠিয়ে দিল।
_ বিজয় অসহায়ের মত নুসরাতের দিকে তাকালো। বিজয়ের অসহায় দৃষ্টির ভাষা নুসরাত বুঝে যায়। আর তাই বিজয়ের কাধে হাত রেখে বলে_
” বিজয়! আমি জানি তুমি কি বলতে চাচ্ছো। আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে কিন্তু বিয়ে’টা হয়ে যায় নি। এখনো হাতে অনেক সময় আছে বিজয়। তুমি যাও জয়ার কাছে। ওকে চলে যেতে দিও না। ফিরাও ওকে। বিজয় ঋন পরিশোধ করতে এসে ও তোমায় চরম ঋনী করে চলে যাচ্ছে। বিজয় চুপ করে থেকো না। ওকে ফেরাও। বিজয় আমার জন্য চিন্তা করো না। তুমি প্লিজ, জয়াকে ফেরাও।”

বিজয় আর কোনো কথা না বলে ছুটে চলল বাসার দিকে। ৫মিনিটের রাস্তা ২মিনিটে পৌঁছালো বিজয়। এদিকে জয়া..?!!!
মায়ের অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে মায়াকে বলে কোনো রকম বেরিয়ে পরল বাসা থেকে। যাওয়ার আগে কথা দিয়ে গেল__
“বিজয় ভাইয়ার বিয়েতে অবশ্যই আসব আমি….দুপুর ২টায় পৌছে যাব বিয়ে বাড়িতে….”

এদিকে বিজয় বাসায় ঢুকে’ই ছুটে চলল জয়ার রুমের দিকে। জয়াকে না পেয়ে দৌঁড়ে আসল মণির কাছে। হাপিয়ে জিজ্ঞেস করল__
” মা! জয়া কই?”
__ মণি কাঁদতে কাঁদতে বলল, হাতে ইয়া বড় ব্যাগ নিয়ে চলে গেছে খালামণি। চলে গেছে…”

বিজয় বসা থেকে উঠে দৌঁড়ে ছুটে চলল বাসস্টপের দিকে। চট্টগ্রামেরর উদ্দেশ্যে গাড়ি এখনো ছাড়েনি। মনে হচ্ছে জয়া এখনো যায় নি।
– হুম, ঠিক তাই।
জয়া এখনো যায় নি।

বাসস্টপে একটা বেঞ্চে চুপ করে বসে আছে জয়া…
মুখ’টা শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। বোধ হয় বিয়ের কথা’টা শুনার পর থেকে ঠিক মত খাইওনি। বিজয় গিয়ে জয়ার পাশে’ই বসল। জয়া আনমনে উদাস দৃষ্টিতে তখনো দুরের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় বাস এসে যায়। বাসের আগমনে ধ্যান ভাঙে জয়ার। বেঞ্চ থেকে উঠে ব্যাগটা হাতে নিতে যাবে ঠিক তখন’ই থমকে দাঁড়ায় জয়া। এ যে ডাক্তার বিজয় দাঁড়িয়ে। যার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে আসছি, সেই ডাক্তার সাহেব’ই দাঁড়িয়ে। জয়া অবাক বিস্ময়ে মুখ খুলল__
” ভাইয়া আপনি? এখানে?!!!
__ হুম, আমি। কেন কোনো সমস্যা???(বিজয়)
__ না, ঠিক সেটা না। আজ তো আপনার হলুদ সন্ধ্যা…তাই বলছিলাম…(জয়া)
__ হলুদ সন্ধ্যা?!!!??
তাই না?????(বিজয়)
__ আচ্ছা, মিস জয়া! আপনি জানেন তো হলুদ সন্ধ্যার পর কি হয়?!!!(বিজয়)
__ বিয়ে….(জয়া)
__ ঠিক তাই।বিয়ে। বিয়ে হয়। আচ্ছা, বিয়ে হলে তো বউ লাগে তাই না???(বিজয়)
_ জি…(জয়া)
_ আর যদি সেই বউটা’ই না থাকে তাহলে কি বিয়েটা হয়?????(বিজয়)
_ মানে??? কি বলছেন এসব???বউ নেই মানে??(জয়া)
— মানে অতীব সহজ।
বউ আমার পালাইছে…..???(বিজয়)

– কি?????(জয়া)
__ জি…. ??(বিজয়)

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here