ফুলশয্যা_সিজন(০৩) পর্ব- ১০

ফুলশয্যা_সিজন(০৩)
পর্ব- ১০
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আছে আঁখির গলা।
” কিরে? কে এসেছে?”
ভয়ার্ত কন্ঠে নুহার জবাব, ‘ছেছেছেলে ধরা…’

ছেলে ধরা মানে? কিসব বলছিস নুহা?
এগিয়ে আসে আঁখি। দরকার সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় সেও।
‘ভাবি, আপনি? অনেকটা কাঁপা গলায় আঁখি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটিকে প্রশ্নটা করে। চমকে যায় নুহা।
আঁখির কথার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে আঁখির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে- ‘ভাবি…?’

কিচ্ছু বলতে পারেনি আঁখি। তার আগেই সেখানে উপস্থিত হয় আঁখির মা তথা হিয়া আন্টি। আঁখির মতোই চমকে উঠেন ওনি। প্রশ্ন করেন, ‘ফারহানা তুতুতুমি?’
নিচু গলায় কতিপয় ভদ্রমহিলা তথা ফারহানার জবাব, অনেক রাস্তা জার্নি করে এসেছি ফুপ্পি। মায়ের শরীরটাও খুব বেশী ভালো নেই। পুরো রাস্তা বমি করে এসেছে। মায়ের একটু বিশ্রাম দরকার। ভিতরে আসতে পারি কি?
ইতস্তত হিয়া ফারহানা এবং তার মাকে রুমে আসার অনুমতি দিয়ে দরজার সামনে থেকে সরে যায়।
ঘটনা কোনদিকে মোড় নিচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না হিয়া। শুভ বিশেষ দরকারে বাজারে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে বাসায় চলে আসতে পারে। আর শুভর আগমন মানেই বড়ো কোন অনর্থের ইঙ্গিত। এই মুহূর্তে হিয়া ওর হাজবেন্ডের উপস্থিতিটা বড্ড বেশী কামনা করছে। হিয়া জানে, ওর হাজবেন্ড আসলে ঠান্ডা মাথায় সবকিছু সামাল দিতে পারবে। কারণ, এ বাসায় শুভ যদি কারো কথা মেনে থাকেন সে শুভর ফুপা তথা হিয়ার হাজবেন্ড। যার প্রত্যেকটা কথা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে চলে শুভ। ছোট থেকে এই ফুপা’ই পিতৃ আদর দিয়েছে কি না….!

ফোনে না পেয়ে হিয়া মেসেজের পর মেসেজ দিয়ে যাচ্ছে ওর হাজবেন্ডকে। হিয়া জানে, পুরো সপ্তাহের মধ্যে এই একটা দিনই ওনি কাজ থেকে অবসর পান আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন। এই সময় ওনাকে ডিস্টার্ব করতে মানা। তা সত্ত্বেও হিয়া মেসেজ দিচ্ছে। দুটোর বেশী কল দেয়নি কারণ ওনার আগে থেকেই বারণ আছে, যত জরুরীই হোক দুটো কলের বেশী যেন না দেয়া হয়। কিন্তু মেসেজ দেয়া তো বারণ করেনি তাই হিয়া একের পর এক মেসেজ দিয়েই যাচ্ছে।
? “বড় এক অনর্থ ঘটে গেছে। যত দ্রুত সম্ভব বাসায় চলে আসো।

? বাসায় আসো।

?প্লিজ বাসায় আসো।

?প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ। বাসায় আসো….”

বন্ধুদের সাথে লুডু খেলায় ভিষণ ব্যস্ত ছিল হৃদয়। একটা সময় সাইলেন্ট করা ফোনের স্ক্রিনের দিকে কি মনে করে যেন দৃষ্টি দেয়। মুহূর্তেই ভেসে উঠে চোখে স্ত্রী হিয়ার মেসেজ। অবিরত মেসেজ আসছেই তখনো। ‘বাসায় কারো কিছু হলো না তো?’ ভয় পেয়ে যায় হৃদয়। ডায়াল করে হিয়ার নাম্বার। রিং একটু বাজতে না বাজতেই রিসিভ হয়ে যায়। চিন্তিত গলায় হৃদয় প্রশ্ন করে-
” ওহ, হ্যালো!
কি হয়েছে হিয়া? শরীর ঠিক আছে তো তোমার?”

ওপাশ থেকে ভেসে আসে আঁখির কন্ঠ।
– বাবা! আমি আঁখি…
— হ্যাঁ- মা! কি হয়েছে বাসায়?
– বাবা! ফারহানা ভাবি এসেছে।
— কিহ? শুভর ববববউ এসেছে?
– হ্যাঁ, বাবা! আমার খুব ভয় হচ্ছে বাবা।
— শুভ ভাইয়া যেকোন মুহূর্তে চলে আসতে পারে বাসায়। তখন যদি ওনাদের দেখে কি যে…
– চিন্তা করিস না মা। আমি আসছি এখনি।

জনাব হৃদয় সাহেব কল কেটে দ্রুত বন্ধুর বাইকে উঠেন। মিনিট তিনেকের মধ্যে বাসার সামনে এসে নামেন। বন্ধুকে বিদায় দিয়ে তড়িগড়ি রুমে ঢুকেন।

রান্না করছিল হিয়া। হাজবেন্ডকে দেখে চিন্তিত মুখে কাছে এসে দাঁড়ায়।
– দেখো না! কোথায় থেকে চলে আসছে এই আপদ!
— প্রশ্ন এটা নয়। প্রশ্ন হলো- কি মতলব নিয়ে এই মাইয়্যা আবার এই বাসায় এসে উঠেছে?
– মেয়ে নয় শুধু। মেয়ের সাথে মা’ও এসেছে…!
— কিহ?
– হু। মা মেয়ে দুজনই এসেছে…
— আমি কি গিয়ে জিজ্ঞেস করব মতলব কি?
– আমার মনে হয় সেটাই ভালো হবে। দ্রুত যাও। শুভ আসার আগেই দেখো কিছু করা যায় কি না…!
— আচ্ছা, দেখছি…

গেস্টরুমের দিকে যাচ্ছিল হৃদয়। পথ বেঁধে দাঁড়ায় নুহা। রান্নাঘর থেকে একরকম দৌঁড়ে আসে হিয়া।
– কি করছিস? আদিরা ওনাকে যেতে দে…
— মাফ করবেন আন্টি। ছোট মুখে বড় কথা বলছি। আসলে আপনারা যা করতেছেন তা ঠিক নয়। মেহমান বাড়ির লক্ষ্মীর ন্যায়। লক্ষ্মীকে এভাবে তাড়িয়ে দিতে নেই।
– তুই জানিস ওরা কে বা কারা?
— শুভ ভাইয়ার প্রাক্তন স্ত্রী এবং ওনার শাশুড়ি।
– জেনেও তুই নীতিকথা শুনাতে এসেছিস?
— আন্টি! আমি নীতিকথা বলিনি। হাজার হোক ওনারা এ বাড়ির অতিথি। আর অতিথিকে এভাবে তাড়িয়ে দিবেন না। এটা ঠিক না…
– তুই ছোট, আদিরা! ভুল-ঠিকের তুই বুঝবিনা…
— হয়তো। তবে এখন ওনাদের কিছু না বলে, যথাযথ আপ্যায়নের পর, রেস্ট নিয়ে, সর্বসম্মুখে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলে ভালো হয় আন্টি।
– কিন্তু শুভ….

পুরো কথা বলতে পারেনি হিয়া। থামিয়ে দেয় হৃদয়। ফিরে তাকায় হিয়ার দিকে।
– সত্যিই হিয়া! বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের বুদ্ধিও হ্রাস পেয়েছে অনেক। রাগের মাথায় কি অভদ্রতার পরিচয়’ই না দিতে যাচ্ছিলাম…
— মানে কি?
– চিন্তা করো না। যাও। রান্না করো গিয়ে।
— কিন্তু শু…
– ওর জন্য আমি আছি। ড্রয়িংরুমে বসছি। ও ভিতরে ঢুকা মাত্রই সবকিছু বুঝিয়ে বলবো।
— তারপর?
– তারপরেরটা পরে বুঝা যাবে। আপাতত তুমি যাও।

হিয়া রোজির মা তথা এ বাসার বুয়ার সাথে রান্নায় হেল্প করতে রান্নাঘরে চলে যায়।

মিনিট পাঁচেক পর রুম থেকে বেরিয়ে আসে ফারহানার মা।
– বেয়াইন এই ভর সন্ধ্যায় কি করছেনটা কি এসব?
— আরে তেমন কিছু না! খাবারগুলো গরম করছি…
– এতকিছু করার কি দরকার ছিল?
— এতদুর থেকে এসেছেন। কিছু তো একটা সামনে দেয়া দরকার…
– এত উতলা হবেন না। লাঞ্চ আমরা বাইরে থেকে করে এসেছি…

ফারহানার মা রুমে চলে গেলে মুখ ভেংচি দেয় হিয়া।
‘হুহ! বয়েই গেছে আমার উতলা হতে…’

খাবারগুলো গরম করা শেষে সেগুলো মেহমানের সামনে উপস্থাপন করা হয়। খাবার উপস্থাপন করে নুহা। খাবার সামনে আসার পর বিনা বাক্যব্যয়ে সেগুলো গলার্দকরন করে নেয় মা মেয়ে। খাওয়া শেষে মেহমানদের সামনে উপস্থিত হয় হিয়া। দৃষ্টি যায় ফারহানার দিকে।

– ওহ, ফারহানা! জিজ্ঞেস করাই তো হলো না। হুইলচেয়ারে কেন তুমি? কোন সমস্যা হয়েছে কি?
— আসলে ফুপ্পি আমার একটা পা পঙ্গু হয়ে গেছে।
– কি বলছ এসব? পঙ্গু হয়ে গেছে মানে?
— আসলে সেদিন আদনানের বাবাকে না বলেই বাসায় চলে গেছিলাম মাকে দেখার জন্য। ফেরার পথে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে আমি আমার একটা পা হারাই…
– কিন্তু আমরা তো শুনেছি…
— আপনারা ভুল শুনেছেন ফুপ্পি। ওরা আপনাকে ভুল শুনিয়েছে। আমি কোন ব্যাংকারের হাত ধরে পালিয়ে যাইনি। আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে হয়েছিল।
– আচ্ছা, মানলাম! মানলাম তুমি কারো হাত ধরে পালিয়ে যাওনি। পা গিয়েছে। এজন্য তুমি এ বাসায় আসতে পারোনি। কিন্তু হাত তো ছিল। সেই হাত দিয়ে কি একটা কল দেয়ার শক্তি পাওনি?
— আসলে ফুপ্পি! ফোনটা রাস্তায় পরে ভেঙ্গে গেছিল। মায়ের ফোনেও ব্যালেন্স ছিল না।

” পুরো বাংলাদেশের কারো ফোনেই কি ব্যালেন্স ছিল না, মিসেস ফারহানা জাহিদ?”

উপরিউক্ত উক্তিটা করতে করতে রুমে প্রবেশ করে শুভ। ভয়ার্ত চোখে দরজার দিকে তাকায় হিয়া। শুরু হয় ফারহানা শুভর কথোপকথন।
” আসলে মা ফোন সম্পর্কে তেমন কিছুই বুঝে না সেটাতো তুমি জানো’ই। তারপরও সেদিন মা তোমার নাম্বারটা নিয়ে দোকানে গিয়েছিল ফোন করার জন্য।”
– তারপর?
— সেদিনই মায়ের ফোনটা ছিনতাই হয়।
– তোমার মা তো কাগজে নাম্বারটা লিখে দোকানে গিয়েছিল। ফোন কি ছিনতাইকারীরা বাসায় থেকে এসে নিয়ে গিয়েছিল?
— আরে! মায়ের হাতে ফোনও ছিল…
– ওহ, আচ্ছা, আচ্ছা! তখন ছিনতাইকারী তোমার মায়ের হাত থেকে ফোন নিয়ে দৌঁড় দিয়েছে?
— সেরকমই। তবে মা বুড়ো মানুষ তো। তাই টের পায়নি ফোনটা কখন কে নিয়ে গেছে?
– পরে?
— মা, ফুপ্পি তোমরা একটু বাহিরে যাবে?

ফারহানার কথামতো ওর মা এবং হিয়া আন্টি বাহিরে চলে যায়। ওরা বাহিরে যাওয়া মাত্রই ফারহানা জড়িয়ে ধরে শুভর পা।
– প্লিজ, শুভ! আমায় মাফ করে দাও। আমার ভুল হয়ে গেছে।
— আরে, আরে! তোমার না এক পা পঙ্গু? ভালো হয়ে গেলো কখন?

শুভর কথায় থতমত খেয়ে যায় ফারহানা। দ্রুত ফ্লোর থেকে উঠে হুইল চেয়ারে গিয়ে বসে। হাসতে শুরু করে শুভ।
– হাঃ হাঃ হাঃ… রাগ করলে নাকি?
— না…
– Good…
— ……..
– তারপর?
— কি তারপর?
– ঐ যে কিচ্ছার বাকি অংশ শুনতে চাচ্ছি।
— তুমি অনেক বদলে গেছ শুভ।
– কি সাংঘাতিক! কিচ্ছার ভেতর আমাকে কেন টানছো?
— শুভ প্লিজ! রসিকতা করো না। আমার শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই।
– ওহ, তাই নাকি?
— আমার জন্য তোমার কি একটুও মায়া হয়না শুভ?
– মায়া? হো হো হো….
— হাসছো যে?
– ব্যাংক ম্যানেজারের টাকায় কমতি পরেছে নাকি?
— ………..
– কি হলো? দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলে কেন? আমার দিকে তাকাও?
— কেউ মনে হয় পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে শুভ…

হাসোজ্জল মুখে দরজার পানে তাকায় শুভ। ছোট্ট একটা ছায়ার মতোন দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ছায়াটা কাঁপছে। ভ্রু- কুচকে প্রশ্ন করে শুভ।
“কে ওখানে? রুমে আসেন….”
মাথা নিচু করে রুমে প্রবেশ করে নুহা। পা দুটো তখনো কাঁপছে। কাঁপুনি এতটাই বেশী ছিল যে এক ঠ্যাং আরেক ঠ্যাংয়ের সাথে বার বার লেগে যাচ্ছিল।
বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করে শুভ-
” কি ব্যাপার? তুমি এই দিন দুপুরে এভাবে কাঁপছো কেন? শীতও তো নেই তেমন আজকে…”

মাথা নিচু থাকা অবস্থাতেই কাঁপা কাঁপা গলায় নুহার জবাব- ‘মাগরিবের আযান দিয়েছে…’
জিহ্বায় কামড় দেয় শুভ। ‘ওহহো! আযান দিয়ে দিয়েছে? যাই, যাই। আমি নামাজ পড়ে আসি…’

নুহার পিছন পিছন শুভও বাহির হয়ে চলে যাচ্ছিল নামাজের জন্য। পিছু ডাকে ফারহানা।
” বাহ! দারুণ পরিবর্তন। ঠ্যালে ধাক্কা দিয়ে দিয়েও যাকে কি না আগে জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদে পাঠানো যেতো না, সে কি না এখন এক কথায় নামাজে চলে যাচ্ছে? সেটাও কি না বাড়ির কাজের মেয়ের কথা’য়….”

শুভ ফিরে তাকায় নুহার দিকে। নুহা দৃষ্টি নিয়ে যায় নিচের দিকে। অতঃপর ঝাপসা চোখে সে স্থান পরিত্যাগ করে।

প্রচন্ড রাগে অগ্নিশর্মা শুভ তেড়ে যায় ফারহানার দিকে। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঠাস করে একটা থাপ্পর মারে ফারহানার গালে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here