ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ১৯

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ১৯
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

” খেলে তো ধরা সবদিক থেকে….!”

পিছনে ফিরে তাকায় নীলিমা। গম্ভীর মুডে আবির দাঁড়িয়ে। কথা বলেনি কোনো। রিক্সাওয়ালাকে নীলিমার ভাড়াসহ ঐ স্যারের ভাড়াটাও দিয়ে দেয়।

রিক্সা চলে যায়। হাঁটা শুরু করে আবির। আবিরের পিছু পিছু নিঃশব্দে হাঁটছে নীলিমা। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। নীলিমা অবশ্য এরই মাঝে বার কয়েক আবিরের দিকে ফিরে তাকিয়েছে, কিন্তু আবিরের সেদিকে একটুও খেয়াল নেই। বরাবরের মতই মাথা নিচু করে চুপচাপ হাঁটছে আবির। বাসায় পৌঁছে দু’জনেই।
” ব্যাগে টাকা আছে, ভাড়া বাবদ যত টাকা লাগে নিয়ে নিও।” নীলিমার হাতে আবির ওর মানিব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে হনহনিয়ে বাহিরে চলে যায়। নীলিমা সেদিকে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে আছে।

আবির চলে গেলে ব্যাগ হাতে বিছানায় বসে নীলিমা। মানিব্যাগের একপাশে দুটো এক হাজার টাকার নোট, আর ৫টা একশ টাকার নোট রাখা। ৫টা একশ টাকার নোট ব্যাগ থেকে বের করে টাকাগুলো ছোট করে ভাঁজ করে নীলিমা ওর আঁচলে বেধে রাখে। তারপর শাঁড়িটা ঠিক করে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নেয়। আবির তখনো আসেনি, তাই ওর আসার আগেই বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নীলিমা বের হয়ে যায় বাসা থেকে।

দুপুর ১টা__
সিএনজির অপেক্ষায় বাসার সামনে দাঁড়িয়ে নীলিমা। সেই সাড়ে ১২টা থেকে এখানে দাঁড়িয়ে, এখবো অবধি কোনো খালি সিএনজি কিংবা রিক্সা আসার নাম নেই। মেজাজ গরম হয়ে যায় নীলিমার। রাস্তার ওপাশের ছোট্ট বেঞ্চে বসার জন্য এগিয়ে যেতেই নীলিমা ছেলেদের হাসির শব্দ শুনতে পায়। বেঞ্চে বসে হাসিটা কোথা থেকে আসছে সেটা বুঝার চেষ্টা করে। পাশেই একটা বিল্ডিং মেরামতের কাজ চলছে। সেই বিল্ডিংয়ের ছাদের উপর কিছু ছেলেপুলে বসে গল্প করছে, হাসিটা সেখান থেকেই আসছে। দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার আগে আবারো ছেলেদের দিকে তাকায়। ৫,৬টা ছেলের মাঝে আবিরও বসে ছিল সেখানে। অপলক ভাবে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকে নীলিমা। হঠাৎ’ই রিক্সাওয়ালার ডাক পরে,
ও আপা যাবেন? যাব বলে নীলিমা রিক্সার কাছে যায়। রিক্সার কাছে গিয়ে আবারো বিল্ডিংটার ছাদের দিকে তাকায়। আবির তখনো গল্পে মশগুল। রিক্সাওয়ালা আবারো বলে, আপা দাঁড়িয়ে ক্যান? কেউ আইব? কোনো উত্তর না দিয়ে নীলিমা আবারো ঐ বিল্ডিংটার ছাদে তাকায়। আবির তখনো গল্পে মগ্ন। ইস! একবার নিচে তাকা, শুধু একবার তাকা। মনে মনে কথাগুলো বলছিল নীলিমা।
আজব লোক’ তো…..!!!
এটা বলে রিক্সাওয়ালা চলে যায়। ফিরে তাকায় নীলিমা। ততক্ষণে রিক্সাওয়ালা চলে গেছে। উফ! চলে গেল বলে নীলিমা পুনরায় বেঞ্চে গিয়ে বসে। আরেকটা সিএনজি আসে। নীলিমা সিএনজিকে না করে দেয়। তারপর আবারো উপরে আবিরের দিকে ফিরে তাকায়। আবির তখনো গভীর গল্পে মশগুল। এরই মধ্যে আরো একটা সিএনজি আসে। এবার নিঃশব্দে নীলিমা সিএনজির কাছে যায়। শেষ বারের মত ফিরে তাকায় উপরে। ততক্ষণে আবিরের দৃষ্টিও নীলিমার দিকে চলে এসেছে। মনে মনে একটা হাসি দিয়ে সিএনজিতে উঠে বসে নীলিমা। আবির দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে আবারো গল্পে মন দেয়।

দুপুর ১টা বেজে ৪৫মিনিট__
নীলিমা বাসস্টপের ছোট্ট বেঞ্চে চুপ করে বসে আছে। বাস চলে যাওয়ার হুইসেল দিচ্ছে তবুও নীলিমা টিকিট কাটেনি। বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। প্রায় মিনিট দশেক পর বাস ছেড়ে দেয়। নীলিমা তখনও রাস্তার এপাশ ওপাশ তাকাচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ২টা বেজে গেছে। মনটা কালো অন্ধকারের ন্যায় করে ওপাশে তাকাতেই দেখে আবির আসছে। মুখে হাসি ফুটে উঠে নীলিমার। তাড়াতাড়ি বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায়।

কিন্তু একি?!!!
ওনি আমার কাছে আসছেন না কেন? এদিকে কোথায় যাচ্ছেন???
মিনিট ত্রিশেক পর হাতে একগাদা সওদা নিয়ে আবির ফিরে। এবার নিশ্চয় আমার কাছে আসবে আমায় বাসায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য? ভাব নিয়ে দাঁড়ায় নীলিমা।
কিন্তু মুহূর্তেই ‘থ’ হয়ে যায় নীলিমা যখন দেখল আবির ওকে কিছু না বলে বাজার সওদা করে আপনমনে বাসায় চলে যাচ্ছে। রাগ হয় নীলিমার কিন্তু প্রকাশ করেনি। কিছুক্ষণ বেঞ্চে বসে থেকে পা বাড়ায় বাসার দিকে। মিনিট দশেক বছর বাসায় পৌঁছে নীলিমা। দরজা খোলায় ছিল তাই কলিং বেল আর চাপতে হয়নি। ভিতরে প্রবেশ করে নীলিমা। আঁচল থেকে টাকাগুলো খুলে বিছানার নিচে রেখে কিচেনের দিকে পা বাড়ায়। আবির তখন গভীর মনোযোগের সাথে রান্না করছে। কিছুক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নীলিমা। তারপর মুখ খুলে_
” আমি চলে যাচ্ছি…..”
আবির চুপচাপ থেকে রান্না করে চলেছে। নীলিমা আবারো বলে উঠে, আমি গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছি। আবির এবারো চুপচাপ। নীলিমা আবারো বলে উঠে, শুনতে পাচ্ছেন আমি নরসিংদী চলে যাচ্ছি। রান্না করা অবস্থায়’ই জবাব দেয় আবির, সেতো আমি দেখেই আসছি আপনি চলে যাচ্ছেন। তো ফিরে আসলেন যে? কিছু রেখে গেছেন নাকি? এত কষ্ট করে আবার আসতে গেলেন কেন? আমায় কল করে বলতেন। আমি দিয়ে আসতাম।

” কোথায় আমাকে আটকাবে তা না,
উনি আমায় চলে যেতে হেল্প করবেন।”

প্রচন্ড রাগে কাঁপতে শুরু করে নীলিমা। ফেলতে থাকে ঘনঘন নিশ্বাস। দাঁতে দাঁত চেপে আবিরকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। ফিরে যায় রুমে। এত শীতের মধ্যে ঘামছে নীলিমা। ফুলস্পিডে ফ্যানটা ছেড়ে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পরে। চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে নীলিমার। হঠাৎ’ই অস্পষ্ট গানের স্বর ভেসে আসে। বিছানা থেকে উঠে বসে নীলিমা। মনে হচ্ছে কিচেন থেকেই শব্দটা আসছে। কিন্তু কে গায়ছে? বন্ধ করে ফেলে ফ্যানটা। নীলিমা স্পষ্ট শুনতে পায় আবির গান গাচ্ছে-
” চলে গেছো তাতে কি, নতুন একটা পেয়েছি।”

” ওহ, এই জন্য’ই বুঝি আমায় এভাবে যেতে দেয়া?”
মেজাজ বিগড়ে যায় নীলিমার। প্রচন্ড রাগে নিজের মাথার চুল নিজে’ই দু’হাত দিয়ে এলোমেলো করে ফেলে। খামচে ধরে মুখ। নিজে নিজেই নিজের হাতে কামড় বসিয়ে দেয়। গালে দু’য়েক জায়গা থেকে রক্ত বের হচ্ছে আর হাতে দাঁতের দাগ বসে গেছে। রাগ তবুও কমছে না। বিছানার পাশেই ছিল আবিরের সদ্য কিনে আনা একটা ছোট্ট সুন্দর ডায়েরী। ডায়েরী কামড়ে ধরে নীলিমা। ডায়েরীর কিচ্ছু হয়নি, কিন্তু ডায়েরীর শক্ত অংশ দাঁতের মাড়িতে লাগার সাথে সাথে মাড়ি থেকে রক্ত বের হওয়া শুরু হয়। এতেও রাগ কমেনি নীলিমার। হাতের কাছে পেল বালিশ, তুলতুলে নরম সুন্দর বালিশটা নিয়ে নীলিমা বারান্দায় ঝুড়ির ভিতর ঢুকিয়ে দেয়। আরেকটা বালিশ ছুঁড়ে মারে বারান্দায়, কোল বালিশটা এক ধাক্কা দিয়ে খাটের নিচে ফেলে দেয়। রাগ তাতেও কমছে না দেখে বিছানা থেকে নেমে চাঁদরটা জড়ো করে বাথরুমে পানি ভর্তি বালতি’তে ডুবিয়ে রেখে আসে, সাথে কম্বলটাও ফ্লোরে ময়লার মধ্যে ঘষে পানিতে ভিঁজিয়ে রেখে আসে। আবিরের চশমাটা ড্রেসিংটেবিলের উপর রাখা ছিল। চশমা হাতে চোখের সামনে এদিক ওদিক করে চশমার একটা গ্লাস কামড়ে ধরে নীলিমা। তেজি মেয়ের এক কামড়ে চশমার ফ্রেম ভেঙে কাঁচগুলো ঠোঁটে গিয়ে বিধে। ওহ, মাগো বলে চশমাটা হাত থেকে ফেলে ঠোঁট ধরে প্রচন্ড জোরে চিৎকার দেয় নীলিমা।

নীলিমার চিৎকার আবিরের কান অবধি বুঝতে বেশী সময় নেয়নি। কেঁপে উঠে আবিরের কলিজা। রান্না রেখে ছুটে আসে রুমে। নীলিমার এ হেন অবস্থা থেকে আবির ভড়কে গেলেও পাশে পরে থাকা ভাঙা চশমা আর রুমের অবস্থা দেখে আবির খুব শিগ্রয়ই বুঝে যায় আসল ঘটনা। একি করছ?!!!
দৌঁড়ে গিয়ে নীলিমার পাশে বসে আবির। ঠোঁট থেকে কাঁচগুলো সরিয়ে নিতেই আরো জোরে চেঁচিয়ে উঠে নীলিমা। “ওমাগো, জ্বাল।
মরে গেলাম গো, জ্বলে যাচ্ছে গো…..”
আবির ওর ময়লা হাতের দিকে তাকায়। হাতে তখনো হলুদ, মরিচের গোঁড়া লেগে আছে। দিগ্বিদিক শূন্য আবির তখনি নীলিমার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়।

[বিঃদ্র:- খুব সমস্যায় আছি, তাই তিন তিনটা দিন আপনাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এজন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। তবে এখন থেকে গল্পের পর্বগুলো সকাল এবং রাত্রে দু’বার করে দিয়ে আপনাদের ক্ষতিটা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ]

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here