ফাগুণের নবধারা পর্ব-১০

0
262
ফাগুণের নবধারা পর্ব-১০
ফাগুণের নবধারা পর্ব-১০

ফাগুণের নবধারা
পর্ব-১০

-শাহাজাদী হুমাশা

সবার সব চাওয়া যে পূর্ণতা পায়না তা প্রকৃতি সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়।সময় বহমান কারো জন্যই তা অপেক্ষা করেনা।মানব জীবনে ঝড় এলে সব লণ্ড ভন্ড হয়ে যায় ঠিক প্রকৃতির মতই।যেমন লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে ওদের আটজনের জীবনটা। প্রকৃতির খেলা বড্ড বিচিত্র।এখানে টিকে থাকে সেই যার খুটি শক্ত।জীবন খাপছাড়া সবার ভাগে সমান সুখ জোটে না।সময় মাঝে মাঝে আমাদের বাধ্য করে সব কিছু মেনে নিতে। মানিয়ে নিতে।নিজের মনের বিপরীতে গিয়েও সুখি হতে কিংবা অভিনয় করতে, বেঁচে থাকতে।আবার মাঝে মাঝে বিপরীত এই পরিস্থিতি থেকেই মানুষ সুখের সন্ধান খুঁজে নেয়।

ঘুম থেকে উঠে রুকু ল্যাপটপ নিয়ে বসলো।ল্যাপটপে অফিসিয়াল কিছু মেইল ছাড়াও দুটো মেইল এক্সট্রা জমা পড়েছে।একটা ইলমার এবং একটা নিধির।রুকু ঠিক করলো আগে ইলমার টাই পড়বে।

ল্যাপটপে ইলমার পাঠানো মেইল পড়ে রুকু চিন্তা মুক্ত হলো।তার কাছে এই বিরক্তিকর সকালটা এখন ভালো লাগছে।ইলমা খুব সংক্ষেপে কিছু কথা লিখেছে।এই যেমন সে ভালো আছে।তার বর এবং ছেলে দুজনেই ভালো আছে।ইলমার মা ও ভালো আছে।ফিলাডেল্ফিয়াতে সে একটা চাকুরী করছে তার চাকরী জীবনও ভালোই চলছে।ইসরাকের সাথে খুনশুটি আর বহু প্রচেষ্টার পর তার জীবন ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে ইত্যাদি।

রুকু ভাবলো এক কাপ কফি খেতে পারলে মন্দ হতো না।
আবিদ রুকুর সামনে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি ধরলো।রুকু অবাক হয়ে দেখলো।বিবাহিত জীবনের ৭ বছর চলছে ওদের।তবুও আজ পর্যন্ত সে আবিদের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।সে এখনো বুঝেনা তার অবচেতন মনে বলা কথা গুলো সে কি করে বুঝে যায়??

রুকু কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে নিধির মেইলটা খুললো।আবিদ বারান্দায় মেঘ আর মানাফকে নিয়ে দুষ্টামিতে মসগুল।নীহারিকা তার গানের ক্লাসের জন্য গিয়েছে।বাসায় শুধু তারা ৫ জন সদস্যই থাকে। আর আবিদ চলে গেলে তারা ৪জন।আবিদের সাথে বিয়ের ৩ বছরের মাথায় মানাফ আসে রুকু আর আবিদের ছোট্ট সংসারে।এখন নীহারিকা, মেঘ আর মানাফকে ঘিরেই আবিদ এবং রুকুর জীবন।শশুড় গত হয়েছেন ২ বছর হলো।শাশুড়ি মা এখন তার ছোট ছেলের সাথে জার্মানিতে থাকেন।বেশ মর্ডান হয়েছেন তিনি।রুকুর ভালো লাগে।তিনি ছেলের বউ এর সাথে থাকেন।আগে রুকুর সাথে সাংসারিক ঝামেলা করতেন এখন ছোট ছেলের বউ এর সাথে করেন না এবং রুকুর সাথেও না।শশুড় মারা যাবার পর থেকে তিনিও শান্ত হয়ে এসেছেন।তবে ছোট ছেলের বউকে তিনি বেশ ভালোবাসেন।এতে রুকু বরং খুশিই হয়।

নিধির মেইল খুলে রুকু বুঝতে পারলো এতো ঝড়ঝাপটার পর অবশেষে সবাই ভালো আছে। শাশুড়ি মাও ভালো আছে।নিধির দু বছরের মেয়ে কণিকা এবং আবিরও ভালো আছে।নিধি সবার একটা ফ্যামিলি ফটো পাঠিয়েছে।

রুকু হাসলো মনে মনে সবাই এখন সবার বর্তমান জীবনে সুখি। আর যে সুখি ছিলো না সেও সুখ খুঁজে পেয়েছে।এ পৃথিবীতে প্রকৃতি সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়।শুধু রুকুর চিন্তা একজনের জন্যই। আর সে সুমু।অত্যন্ত চঞ্চল আর ভালোবাসায় ঘেরা মেয়েটা কেমন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। নাভিদ ছাড়া যার চলতো না সে এখন নাভিদের স্মৃতি এবং শেষ চিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছে।

রুকু ল্যাপটপ রেখে আবিদের কাছে গেল। বাচ্চা দুটো খেলছে।আবিদ ফোনের স্ক্রিনে সবার ছবি দেখছে।গ্যালারি ঘেটে সে সেই দিনের ছবিগুলো দেখছে যেগুলো কক্সবাজার যাবার আগের দিন রাতে ট্রেণে তোলা হয়েছিলো।সবার হাসিমুখের ছবি।রুকুর দেবর আবিরও আছে এই ছবিতে জার্মানি থেকে বেড়াতে এসেছিলো ছুটিতে।ফাহিম, ইলমা, নিধি,আবির,রুকু,সুমু,নাভিদ,আবিদ,মেঘ আর নীহারিকার ছোটবেলার উজ্জ্বল মুখের কিছু ছবি।রুকুর মন টা ধক করে উঠলো।মনে পরে গেলো সে রাতের পর সকালের সময়টা। কে জানতো কক্সবাজার তাদের জীবনে এত বৈচিত্র্য নিয়ে আসবে যে জীবন নামক নদীর গতিপথ পালটে যাবে।

রুকুরা সকালে ট্রেণ থেকে নেমে প্রথমে নিঝুমের বাসায় যাওয়ার প্ল্যান করলো। তারা নিঝুমকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো।যেই ভাবা সেই কাজ।নিঝুমের অফিস থেকে তার বাসার ঠিকানা নিয়ে ওরা সবাই রওনা হলো।
নিঝুমের বাসায় পৌঁঁছেই বেল বাজালো ওরা।দরজা খুললো একজন মহিলা।ঠিক মহিলা বলা চলে না মেয়ে। বয়স বেশি না।২২-২৪হবে।হলুদ রঙা সুতি শাড়িতে গাড় সবুজ রঙা পার।দেখতে বেশ সুন্দর।মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো কাকে চাই?? রুকুরা ভেবেছিলো হয়তো ভুল বাসায় চলে এসেছে ওরা।কিন্তু ভেতর থেকে যখন নিঝুমকে কথা বলতে আসতে দেখলো সবাই ভাবলো ঠিকানাতো ঠিকি আছে কিন্তু মেয়েটা কে?? নিধির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।রুকু সামনে দাঁড়ানো মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভিতরে চলে গেলো।নিঝুম ভয়ে শেষ।এখন কি বলবে সবাইকে? রুকু আপাকে কি করে বোঝাবে সব??রিদিমাকেই বা কি বলবে?

রিদিমা ধাক্কা খেয়ে রেগে রুকুর হাত টেনে ধরলো। রুকু সব বুঝে গিয়েছে।রিদিমা চিৎকার করে বলছে – এরকম অভদ্রের মত কারো বাসায় পরিচয় না দিয়ে প্রবেশ করছেন কোন সাহসে?? আমি সিকিউরিটি কে ডাকবো বের হন বাসা থেকে।
– নিঝুম রিদিমাকে চুপ করতে বলতে না বলতেই ঠাস ঠাস করে কতগুলো চড়ের আওয়াজ হলো।সবাই এহেন অবস্থায় হতভম্ব।
রুকু প্রথমে নিঝুমের দুগালে দুটো চড় দিলো।এবং সাথেসাথেই পিছে ঘুরে রিদিমার গালেও একটা কসে চড় বসালো।রিদিমা সোফার উপরে গিয়ে পড়লো চড়ের ঝাক্কি সামলাতে না পেরে।নিঝুম কিছু বলতে পারছেনা। নিধি দরজার কাছে বসে পড়েছে অবাক হয়ে ছলছল চোখে সব দেখছে।তার অস্বস্তি হচ্ছে এখানে থাকতে তার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে।আবির বুঝতে পেরে ইলমার কানে কানে কি যেন বলে নিধিকে টেনে নিয়ে গেলো বাসার বাহিরে।আবিদ রুকুকে জাপটে ধরে আছে রাগে থরথর করে কাঁপছে রুকু আর কেঁদে যাচ্ছে।নাভিদ আর সুমু অবাক।সুমুকে নাভিদ ধরে সোফায় বসিয়ে দিলো।ঘটনার আকষ্মিকতায় সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে।রিদিমা ভিতরের রুমে যেতে নিয়েছিলো।সেও বুঝতে পেরে গিয়েছে এরা কারা? এরা নিঝুমের পরিবার।যাদের ছবি না দেখলেও নিঝুমের কাছ থেকে তাদের কথা শুনেছে সে বহুবার।সে কখনই চায়নি নিঝুম এদের কাছে ফিরে যাক।সে বহু কাঠখর পুরিয়ে নিঝুমকে বাগিয়েছে।নিঝুমকে হারাতে চায়না সে।তাই নিঝুমকে আর ঢাকামুখী হতে দেয়নি সে।কিন্তু কে জানতো তারা এখানে চলে আসবে? রাগে আর গালের ব্যাথায় সে কাপঁছে।রুকুকেও চড় দিতে চেয়েছিলো কিন্তু নিঝুম তার গালে আরেকটা চড় বসিয়ে দিয়েছে।গালে হাত চেপে সে ভেতরের রুমে চলে গিয়েছে।

আবিদ রুকুকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।রুকু কেঁদেই যাচ্ছে।তার কাছে নিজেকে নিধির অপরাধী মনে হচ্ছে।সে চারপাশ তাকিয়ে নিধির কথা জিজ্ঞেস করতেই সুমু বলছে আপা ও ঠিক আছে।নিঝুম রুকুর পায়ের কাছে বসে আছে।নিধির কথা শুনতেই সে হকচকিয়ে গিয়েছে।এতক্ষণে সে ইলমা আর ফাহিমকেও দেখলো।নাভিদ কাউকে কিছু না বলেই ট্যাক্সি ডেকে নিলো।তারা এখনি হোটেলে রওনা দিবে।নিঝুম রুকুর পা ধরে বসে আছে।ক্ষমা চাইছে।রুকু শুধু বললো – তুই আমাদের একবার বললেও পারতিস আমরা কেউ তোর সুখের আড়ে আসতাম না।শুধু শুধুই একটা মেয়েকে কষ্ট দিলি।ভালো থাকিস আর আজকের পর আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করিস না।
রুকু বের হয়ে এলো নিঝুমের বাড়ি থেকে সবাই তার পিছু পিছু চলে এলো।এরপর নিঝুম রুকুর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি।রুকুর বাবা মা এখন সুমুর সাথেই থাকে।নাভিদের শেষ স্মৃতি নিয়েই তাদের বসবাস।

সেদিনের পর রাতের ট্রেনে সবাই ফিরে আসতে চেয়েছিলো কিন্তু রুকু সবাইকে বুঝিয়ে ওখানেই কিছু দিন থাকলো।সবাই মিলে অনেক আনন্দ করলো।আবিরের সান্নিধ্যে নিধিও সব কিছু ভুলে ব্যাপারটা মানিয়ে নিলো।নিঝুম আর তার স্ত্রী রিদিমা এসেছিলো হোটেলে তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে কিন্তু রুকু দেখা করেনি।রুকুর বাবা মায়ের সাথে অবশ্য নিঝুমের এখনো কথা হয়।নিঝুম আর রিদিমার এখনো কোনো সন্তান নেই।সমস্যাটা নাকি রিদিমার।

রুকুরা কিছুদিন আনন্দ করেই ফিরে এলো ঢাকায়। সবাই সব কিছু মেনে নিয়েছে।এখন আর সমস্যা নেই।

চলবে…..