ডুমুরের ফুল ৪.

0
351
ডুমুরের ফুল ৪.
ডুমুরের ফুল ৪.

ডুমুরের ফুল
৪.
ক্যালকুলেটর বেঞ্চের উপর রেখে দিয়ে জাদিদ যেখানে ছিলো সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। জাদিদ মনে মনে ভাবছে যাক খুব ভালো ভাবেই চমকে দিলাম। এবার ক্যালকুলেটর নিতে ওর বাড়ি যাবো। মেয়েটাকে দেখে যা মনে হচ্ছে ছেলে ফ্রেন্ড ওর নাই। আর বাসায়ও মনে হয় ছেলে ফ্রেন্ড এলাউ না।আমার দিকে তাকিয়ে থাকার ঝাল তোমাকে বোঝাবো খুব ভালো ভাবেই।
জাদিদ মনে মনে প্ল্যান করছিলো ঠিক এই সময় স্যার বই নিয়ে হাজির।
বইটা জাদিদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন
– নাও এই বইটা। যদি এটাতে কাজ না হয় তাহলে আরো বই আছে।
জাদিদ বই নিয়ে বলল
– থ্যাঙ্কু স্যার। স্যার আসি।
– হুম।
আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
সবাই হেমলতার দিকে তাকিয়ে ছিলো। হেমলতা ঘটনার আকস্মিকতায় চুপ হয়ে গেছে।
উত্তর টা লিখে সে বসে রইলো। স্যার চলে আসাতে সবাই আবার খাতায় মনোযোগ দিলো।
খাতা জমা দিয়ে যখন সবাই বের হলো। হেমলতা মিম্মার জন্য অপেক্ষা করছিলো। মিম্মা স্যারের সাথে জরুরী কথা বলছিলো।
কয়েকজন মেয়ে দূর থেকে হেমলতাকে ইংগিত করে কিছু বলছিলো।
হেমলতা বুঝতে পারছিলো ওকেই কিছু বলছে কিন্তু কী যে বলছে সেটা শুনতে পারছিলো না। আজকে যা ঘটেছে সেটা তার চিন্তার বাইরে ছিলো। তার মতো এতো সাধারণ মেয়েকে কোনো টপার স্টুডেন্ট তো পছন্দ করতে পারেনা। আর সেতো ওই ছেলের কোনো ক্ষতিও করেনি তাহলে এমন ক্যান করলো?
এই ধরনের ফাজলামি করার কোনো মানে হয়না। প্রত্যেকটা মেয়ে তার দিকে কীভাবে যেন তাকাচ্ছে। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে! এমনিতেই কেউ ওর সাথে কথা বলে না।
মিম্মাকে বের হয়ে আসতে দেখে হেমলতা একটু স্বস্তি ফিরে এলো।
মিম্মা কে একটু চিন্তিত লাগছে। হেমলতা জিজ্ঞেস করলো
– কিরে কিছু হয়েছে?
– জাদিদ এমন করলো ক্যান? ওর সাথে তোর কোনোদিন কথাও হয়নি।
– আমিও জানি না।
– ফেসবুকে চ্যাট হয়?
– না তো এডই তো নাই।
– শোন ওই ছেলে তোর সাথে মজা করছে। কারণ যখন তোর সাথে ও কথা বলছিলো তখন ওর চোখে দুষ্টুমি খেলা করছিলো।
– আমি কী করলাম?
– সেটা তো আমিও জানি না। ক্যালকুলেটর ঠিক আছে না?
– হ্যা ব্যাগে রেখে দিয়েছি।
– যত্ন করে রাখিস। যেকোনো সময় ও রাস্তায় তোর কাছে ক্যালকুলেটর চেয়ে বসতে পারে।
– যখনি বের হবো তখনি সাথে নিয়ে বের হবো।
বাট আমার সাথে এমন করলো ক্যান?
– ধুরো আমি জানি না।
তারপর মিম্মা হা হা হা করে হেসে উঠলো।
হেমলতা বলল
– হাসার কী হলো?
মিম্মা হাসতে হাসতে বলল
– সবাই তোকে জাদিদের জিএফ ভাবছে।
– কী?
– হুম। আরে ওর তো কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড নাই। কারণ হিসাবে সবাই জানতো ও মনে হয় ওসব পছন্দ করেনা। কিন্তু আজকে অনেকে তার কারণ হিসেবে বের করেছে যে – জিএফ এর ভয়ে ও কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড রাখে না।
হেমলতা হতাশ হয়ে বলল
– কিন্তু এটা সত্যি না।
– সেটা তুই আর আমি জানি যে এটা সত্যি না। কিন্তু কেউ তো সেটা জানে না।
– আমরা বললেই তো বিশ্বাস করবে। তাই না?
– না কেউ বিশ্বাস করবে না। যেভাবে ওই পোলা তোর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। আর কথা বলার স্টাইল……..
হেমলতা মিম্মার কথার মাঝে কথা বলল
– শুধু ওভাবে কথা বললেই কী হয়?
– শুনো মানুষ তার চোখের সামনে যা ঘটে তাই বিশ্বাস করে। এর পিছনের কারণ, আসল কারণ কখনোই দেখেই না।
হেমলতা একেবারেই চুপ হয়ে গেলো।
মিম্মা হাসতে হাসতে বলল
– শোন তুই একা ঝামেলায় পড়িস নাই। জাদিদ তো নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে।
– কিসের কুড়াল? ছেলে মানুষ এর আবার কি? হাজার টা প্রেম করলেও বা কী?
– তোর নানী জানলে কী হতে পারে?
– জানি না।
হেমলতার জীবনে প্রথম এমন ধরনের ঘটনা ঘটলো।
মিম্মা রিক্সায় করে চলে গেলো। হেমলতা ওটোর জন্য দাঁড়ায় আছে।এতো ওটো কিন্তু আজকে কোনো ওটো পাচ্ছেনা। মেজাজ এমনিতেই খারাপ এখন আরো খারাপ হচ্ছে।
পাশে এসে কে যেন দাঁড়ালো।
হেমলতা তাকিয়ে দেখে বিরক্ত হলো। এই ছেলের জন্য আজকে সবাই তাকে নিয়ে আলোচনা করছে।
জাদিদ আশেপাশেই ছিলো। অপেক্ষা করছিলো কখন এই কেশবতী একা হবে। একা দেখেই সে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। হাত টা ধরলে কেমন হয়?
না না বেশি হয়ে যায়। মেয়েটা এমনিতেই মনে হয় ভয়ডর পেয়েছে। একটু হাসিহাসি মুখে মেয়েটাকে বলল
– এই মেয়ে এতো সোজা ভাগ কেন পারো না?
হেমলতা কিছুই বলল না। কী বলবে? মিম্মাও তো চলে গেলো।
– কথা বলবা না?
– আচ্ছা আপনি তো আমাকে চিনেন না। তাহলে কথা বলতে আসছেন কেন?
– আচ্ছা কথা না বললে কীভাবে পরিচিত হবো?
– তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু সবার সামনে এভাবে
আর কিছুই বলতে পারলো না। গলা আটকে আসছে তার।
– আসলে গত পরশুদিন তুমি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলে। মনে হচ্ছিলো
গত পরশুদিন তো? হেমলতার মনে পড়লো। সত্যি তো ওর দিকে তো হা করে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু ও কীভাবে খেয়াল করলো?
হেমলতাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল
– ধরা পড়ে গেছো
একটা ওটো ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। হেমলতা প্রায় দৌড়ে ওটোতে উঠলো।
হেমলতা শান্তির নিশ্বাস ছেড়ে ভাবলো
– যাক বাঁচলাম।
জাদিদও দৌড়ে অটোতে উঠলো।
হেমলতা দেখেও না দেখার ভান করলো।
জাদিদ হাসতে হাসতে বলল
– তোমার বাড়ি যাবো আজকে।
হেমলতা কোনো উত্তর দিলো না।
তারপর আস্তে আস্তে বলল
– আমি আপনার দিকে তাকিয়েছি।তাতে কী এমন হয়েছে? যে আমার পিছুপিছু ঘুরতে হবে? কতো মানুষ তো আপনার দিকে তাকায়। তাই বলে কি সবার পিছুপিছু আপনি ঘুরে বেড়ান?
– না।
– তাহলে?
– মন চাইলো। তাই!
– মন চাইলেই কি সেটাই করতে হবে?
– আসলে আমার মন যা চায় আমিই তাই করি। মন বলল তোমাকে একটু জ্বালাতে। তাই
– আমার অনেক বড় ভুল হয়েছে। আর কোনোদিন ভুলেও তাকাবো না।
– আবারো তো তাকালে
– না তাকিয়ে কথা বলা যায়?
– তুমিই তো বললা ভুলেও তাকাবা না।
হেমলতা কী উত্তর দিবে বুঝতে পারছিলো না।
জাদিদ গম্ভীর ভাবে বলল
– কথার প্যাঁচে পরে গেছো।
হেমলতা বাইরের দিকে তাকিয়ে জাদিদকে গুরুত্ব না দেয়ার ভান করলো।
কী আজব! এই কাউয়ার বাসাকে সে মনে মনেই খুজছিলো। আর এখন সেই তার সামনে বসে আছে।
ওদের বাড়ির সামনে আসার সাথে সাথেই হেমলতা নেমে পরলো।
ভাড়া দিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে হলো। ক্যালকুলেটর এর জন্য এই ছেলে ওর বাসায়ও আসতে পারে।
তাই সে ব্যাগ থেকে ক্যালকুলেটর বের করে পিছনে ঘুরে দাঁড়ালো। কিন্তু ততক্ষণে ওটো অনেক দূরে চলে গেছে।

মিম্মাকে সব জানাতে হবে।
জাদিদ ওটোর পিছনের ফাকা দিয়ে দেখছিলো – মেয়েটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
সে নিজেও জানে না কেন এমন করলো?
মেয়েটা মনে হয় একটু সেকেলে ফ্যাশনের। চুল তো হাটু সমান।
চুলে কোনো কাট দেওয়াও নাই।
ভুরু প্লাগ ও করেনা।
জামা কাপড়ে শালীনতা উপচে পড়ছে। হাতে একটা ঘড়ি তাও কালো ফিতার। আদ্দিকালের।
চোখ দুটো মায়াবী।
নাক একটু বেশিই বোঁচা।
কথা যখন বলছিলো তখন কান লাল টকটকে হয়ে ছিলো।
মজাই লাগছে মেয়েটাকে বিরক্ত করে।
ক্যালকুলেটর টা মেয়ের কাছেই থাকুক। তাহলে ভয়ে ভয়ে থাকবে। এমনিতেই আমার ক্যালকুলেটর লাগে না। ফিজিক্সের গণিত করতে গেলে লাগে তাও ঠ্যাকায় না পড়লে ব্যবহার করে না।
অটো ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো ভাই আপনি কই যাবেন?
অম্বিকায় নিয়ে যান।
জাদিদের একটা আফসোস রয়েই গেলো মেয়েটার নাম জানা হলো না।
নাম জানা কোনো ব্যাপার না।
ওর সাথের মেয়েটাকে চিনি।
প্রত্যেক ছেলের মেয়ে ফ্রেন্ড থাকেই। জুবায়ের এর তো অনেক মেয়ে ফ্রেন্ড। ফেসবুকে কতো চ্যাট করে।
অনেক মেয়ে অবশ্য নক করে। কিন্তু গায়ে পরা মেয়ে আমার ভালো লাগেনা। মেয়ে হবে এই কেশবতীর মতো।
দাদীর কথায় জাদিদ এতদিন মেয়েদের সাথে সেধে কথা বলতো না। তার দাদীর কড়া হুকুম
– কোনো মেয়েছেলের সাথে মিশবা না।
এতদিন হুকুম সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।
কিন্তু এখন আর সে মানবে না এই হুকুম। সে মনে মনে স্থির করে ফেলেছে এই মেয়েকে তার ফ্রেন্ড বানাবে।
মনে মনে জাদিদ একটা শব্দই বলছে
– কেশবতী, কেশবতী….!

চলবে….!

#Maria_kabir