ডুমুরের ফুল ১০.

0
309
ডুমুরের ফুল ১০.
ডুমুরের ফুল ১০.

ডুমুরের ফুল
১০.
ফোন রেখে দেয়ার পর হেমলতাকে দেখার ইচ্ছে জাগলো। জাদিদের মনে হচ্ছিলো অনেকদিন দ্যাখেনি। কিন্তু মাত্র ৫-৬ দিন আগেও দেখা হয়েছে। হেমলতাকে কল করলো। হেমলতা কেবল চোখ বুজেছে আর তখনি ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো। সে এক চোখ বন্ধ রেখে আরেক চোখ খুলে কল রিসিভ করলো।
তারপর বলল
– কি?
জাদিদ একটু হেসে বলল
– ঘুমুচ্ছো?
– তুমি কী ঘুমুতে দিচ্ছো? কেবলি চোখ বুজেছি আর তুমি ফোন দিলা।
– আরে বাহ! আমি তো একবারমাত্র ফোন করলাম। আর আমার দোষ হয়ে গেলো?
– আর প্যাঁচানো বন্ধ করে বলো কী কারণে ফোন করলা?
– আমাকে খুব বিরক্তিকর লাগছে তোমার? কথা বলার তেমন কেউ নাই তাই ফোন করলাম আর তুমি?
হুট করে জাদিদ রেগে যায়। আজকেও তাই। রেগে গিয়ে ফোন কেটে দিয়ে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইলো।
জাদিদের কথায় পুরোপুরিভাবে বোঝা যাচ্ছিলো যে সে রেগে গেছে। রাগের কারণটা হেমলতা বুঝতে পেরে জাদিদকে কল দিলো। জাদিদ ফোন রিসিভ করে বলল
– তুমি নাকি ঘুমাবা? তাহলে আমাকে ফোন দিলা ক্যান?
– আমি অনেক দুঃখিত।
– কেন?
– তোমাকে রাগিয়ে দিলাম তাই ।
– এক শর্তে আমি দুঃখিত শব্দটা গ্রহণ করবো।
– বলে ফেলো।
– সত্যি তো?
– হ্যা!
কখনো হেমলতার ছবি জাদিদ চায়নি। কেমন যেন লাগছিলো ওর। তারপরও কাঁপা স্বরে বলল
– না মানে তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তাই আর কি একটা ছবি যদি ইনবক্সে দিতা। ভালো হতো।
হেমলতা জাদিদের কাঁপা স্বর শুনে হাসতে শুরু করলো।
হেমলতার হাসি তার বরাবরি ভালো লাগে কিন্তু আজকের হাসিতে তার কেমন যেন লজ্জা লাগছিলো। জীবনের সতেরো টা বছর সে পার করেছে কোনোদিন বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কোনো মেয়ের সাথে সে সেধে কথা বলেনি ছবি চাওয়া তো দূরে থাক। ফেসবুকে সে অনেক সুন্দরী, স্মার্ট মেয়েদের ছবি দেখেছে তেমন একটা ভালো লাগেনি। ফেসবুকে রিএক্ট অপশন থাকা সত্ত্বেও সে শুধু লাইক দিয়েই চলে এসেছে। কোন একটা মেয়ের ছবিতে কমেন্ট করেছিলো কারণ মেয়েটা তাকে ইনবক্সে কমেন্ট করতে বলেছিলো। তারপর নোটিফিকেশন আসতে আসতে সে শেষ পর্যন্ত কানে ধরেছে বাইচ্চা থাকতে সে কোনোদিন কোনো মেয়ের ছবিতে কমেন্ট করবেনা।
আর আজকে সেই ছেলে খুব সাধারণ এক মেয়ের কাছে ছবি চাচ্ছে।
হেমলতা হাসতে হাসতেই বলল
– আহারে।
ছবি তো তেমন তোলা হয়না। যা আছে তার মধ্যে থেকেই দিচ্ছি।
ফেসবুকে আসো।
– হুম।
ইনবক্সে কয়েকটি ছবি সেন্ড করে মেসেজ দিলো
– এখন আমি ঘুমাই।
– যাও ঘুমাও।
হেমলতা নেট কানেকশন অফ করে ঘুমাতে চেষ্টা করলো। একবার ঘুম ভাঙলে তার আর ঘুম আসেনা। ছবি চাওয়ার কারণ টা তো জাদিদ বলল। কিন্তু তাকে দেখতে কেন মন চাবে তার?
সেদিন যখন ও আমার চুল বেধে দিচ্ছিলো তখন ওর চোখে অন্য কিছু খেলা করতে দেখেছি।
যেভাবে আমাকে দেখছিলো তাতে তো অন্যকিছু বোঝাচ্ছে। কিন্তু কী বোঝাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি না। এই প্রথম কোনো পুরুষের চোখে তার জন্য কিছু একটা দেখেছে। সে কি আমায়?
প্রশ্নটা করেই হেমলতা তাচ্ছিল্য স্বরে নিজেকেই বলল
– নাহ হতে পারেনা। ওর সম পর্যায়ের আমি না। ফ্রেন্ড হিসেবে নিয়েছে বলেই কি…….
ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও বুঝতে পারেনি।
ছবিগুলো দেখতে তার ভালোই লাগছে। এই প্রথম সে হেমলতাকে সাজা অবস্থায় দেখলো। সাজার ধরনে মনে হচ্ছে কোনো বিয়েবাড়ি তে দাওয়াতের সময় তোলা ছবি।
গাঢ় জাম রঙের শাড়ি পড়া, চোখে কাজল, জাম রঙের লিপস্টিক, চুল ছাড়া। দুইহাতে অনেক চুড়ি। সব মিলিয়ে হেমলতাকে তার অসম্ভব সুন্দরী লাগছে। আসলে যারা সবসময় খুব সাধারণ ভাবে থাকে তারা সাজলে অসম্ভব সুন্দরী লাগে।
জাদিদ শাড়ী পড়া ছবিটা দেখছে। হেমলতাকে কেউ সাজিয়ে দিয়েছে। ও তো চুল বেণী ছাড়া কিছুই পারেনা আর এভাবে সাজা তো অসম্ভব।
কেশবতী কেশ এলিয়ে দিয়ে এখন বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। কথাগুলো নিজে নিজেই উচ্চারণ করছে।
সে যে প্রেমে পড়তে পারে এটা ওকে যারা চিনে তারা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না।
প্রত্যেকটা মানুষ জীবনে একবার হলেও প্রেমে পড়ে।
জাদিদ বই গুছিয়ে রেখে ঘুমাতে গেলো। স্বপ্ন তাকে তাড়া করে ফিরছে। স্বপ্ন টা তাকে সুখী করছে। কিন্তু একবারের জন্যেও তার মাথায় আসছে না যে হেমলতা তার নাও হতে পারে। ছোটবেলা থেকে সে যা চেয়েছে তাই পেয়ে এসেছে। সে বুঝতে পেরেছিলো তার মা বাবা কখনো আর একসাথে থাকবে না। তাই সে কখনো সেটা চায়নি।
পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে হেমলতাকে মেসেজ দিলো
– all the best
হেমলতা মেসেজের রিপ্লে দিলো
– all the best

তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ আর বাকি খালি ব্যবহারিক পরীক্ষা। ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হলেই জাদিদ ঢাকা চলে যাবে। তার বাবা ঢাকার কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে রেখেছেন।
হেমলতার ফরিদপুর ছেড়ে কোথাও যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নাই। কারণ তার নানী অনেক অসুস্থ। তার খুব ইচ্ছে ছিলো নাত্মীকে বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন কিন্তু শরীর এতো খারাপ যে তার এখন বৃদ্ধ বয়সের শেষ সম্বলকে দূরে পাঠাতে মন মানছে না।
নানীর এই অবস্থা দেখে সেও ফরিদপুর এর বাইরে না যাওয়ার চিন্তা করেছে।
জাদিদ এই কথা শোনার পর বলেছে
– তুমি তোমার নানীর কাছেই থাকো। ফরিদপুরেও তো সরকারি মেডিকেল কলেজ আছে, ফরিদপুর ইঞ্জিনিয়ার কলেজ আছে তারপর রাজেন্দ্র কলেজ আছে।
– আমার মেডিকেল কলেজে পড়ার ইচ্ছা নাই। কাটা ছেঁড়া ভয় লাগে।
– ইঞ্জিনিয়ার কলেজে পড়বা
– নাহ আমার অনার্স করার ইচ্ছা।
– হ্যা খারাপ কী? রাজেন্দ্রতে তো পিওর সাইন্সের সাবজেক্ট আছে।
– আমার বাংলা নিয়ে পড়ার ইচ্ছা। খুব সহজ সাবজেক্ট। বেশি পড়া লাগবে না।
– শুনো বাংলা সহজ না। ছন্দ, মুক্ত অক্ষর উপন্যাসের ব্যাখ্যা পড়তে পড়তে বুঝবা।
– হইছে ভয় দেখানো লাগবে না।
– আমি ভয় দেখাচ্ছি না। সত্যি টা বললাম। তুমি যদি পারো আমার কী?
– হ্যা তাই তো।
ব্যবহারিক পরীক্ষা রসায়ন বাদে সবগুলো ভালোই হয়েছে হেমলতার। রসায়ন প্রথম পত্র ব্যবহারিক পরীক্ষায় লবণ দেয়া হয়। সনাক্ত করার জন্য। রঙিন লবণ সনাক্ত করা সহজ। আর ইন্টারমিডিয়েট এ একটাই লবণ দেয়া হয়। কিন্তু হেমলতার কপালে পরলো সাদা লবণ। সাদা লবণ সনাক্ত করা কঠিন। কারণ এতে সবগুলো গ্রুপ টেস্ট করতে হয়। সে বিশাল ঝামেলা। যারা পারে তাদের কাছে কম ঝামেলার। কিন্তু হেমলতা এতদিন ফাঁকিবাজি করে এসেছে। আর এখন তো তার ঠ্যালা বুঝছে। খাবার লবণও তো সাদা হয়। তাই হেমলতা ভাবলো খেয়ে দেখতে পারে। অল্প একটু লবণ জিহ্বায় দিয়ে বুঝতে পারলো এটা খাবার লবণ অর্থাৎ সোডিয়াম ক্লোরাইড।
ল্যাবরেটরি এর লবণ। শত শত স্টুডেন্ট পরীক্ষা দিয়েছে। লবণে যে ময়লা ছিলো আর সেটা যে ক্ষতি করতে পারে এটা হেমলতার মাথায় আসেনি। সোডিয়াম ক্লোরাইড এর সাথে যে লেড লবণ মিশ্রিত ছিলো সেটা কারো জানা ছিলো না। আর এটা ভুলবশত হেমলতাকে দেয়া হয়েছে। লেড লবণ গুলো সাধারণত বিষাক্ত হয়।

চলবে…..!

#Maria_kabir