জীবন সঙ্গী ৬ষ্ঠ পার্ট

0
715

জীবনসঙ্গী ৬ষ্ঠ পার্ট
#Shohag_Hasan_Niloy

নিলয় রুমে এসে দেখল তাসপিয়া তার শাড়ির আচল দিয়ে চোখের পানি মুছছে।
তা দেখে নিলয়ের কিছুটা খারাপ লাগল,তবুও নিজেকে কন্ট্রোল করে তাসপিয়ার কাছে গিয়ে তার পাশেই বসল।
নিলয় তাসপিয়ার হাত ধরে বলল—- কি হলো কান্না করছ যে!
তাসপিয়া কান্নাভেজা কন্ঠে বলল—– না কিছুনা,এমনি চোখে কিছু একটা পরেছে হয়ত।
নিলয় তাসপিয়ার দুগালে হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল—— দেখ,আমার কাছে একদম মিথ্যে বলার চেষ্টা করবে না।আমি জানি আমার চলে যাওয়ার কথা শুনে তুমি মন খারাপ করে কান্না করতেছ।
তাসপিয়া তাৎক্ষণিক নিলয়কে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলল—–আমি এমনটা কখনওই ভাবিনি যে এভাবে কাওকে ভালবেসে এত আপন করে নিব।কিন্তু আমার কি এমন হলো যে এক রাতেই তোমাকে এত আপন করে ফেলেছি।এখন মনে হচ্ছে তুমি আমার কাছে জনম জনমের চেনা পরিচিত।
আমি যে খুব বেশিই ভালবেসে ফেলেছি তোমাকে।
নিলয় তাসপিয়ার চোখের পানি দুঠোট দিয়ে চুষে নিল।তাসপিয়া কে শান্ত করে বলল——এটা না হওয়াই স্বাভাবিক। কারন কেওই জানে কে কখন কার প্রেম ভালবাসায় আসক্ত হয়ে যায়।ভালবাসা যে এক মনের সাথে অন্য মনের আকর্ষন।যে আকর্ষন সৃষ্টি হলেও কেও কাওকে ছাড়া থাকতে পারে না।
দুটি মন যখন একত্রিত হয়ে একটি মনে রুপান্তরিত হয় তখনি ভালবাসার শক্তিশালী বন্ধন সৃষ্টি হয়।তখনি কেও কাওকে ছাড়া এক মুহুর্ত থাকতে পারে না।
আর আমাদের ভালবাসার বন্ধন তো পবিত্র।আল্লাহ তায়ালার পবিত্র কালাম পরে আমরা এই বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি।যখন থেকে কালিমা পরে আমরা কবুল বলার মাধ্যমে একে অপরকে মেনে নিয়েছি ঠিক তখন থেকেই আমাদের আমলনামায় নেকি লেখা শুরু হয়েছে,যা লেখা হতে থাকবে মৃত্যুমুহূর্তের আগ পর্যন্ত।
আর আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে একে অপরের প্রতি ভালবাসার নূর সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
আমাদের এই পবিত্র ভালবাসায় আল্লাহ তায়ালার রহমত আছে।
আমিও চাই না তোমাকে ছাড়া থাকতে।
কিন্তু আমারও যে কোন উপায় নেই।সামনে সপ্তাহে আমাকে অফিসের কাজে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে হবে।
এখন চাইলেও আমরা একত্রে থাকতে পারব না।
তাই এখন আমাদের একটু শক্ত হতে হবে।ঈদের পর ইনশাল্লাহ আমরা কক্সবাজার ভ্রমনে যাব।
তুমি এখন আর মন খারাপ করে কান্না করো না প্লিজ, তাহলে আমিও যে অফিসে , বাসায় মন বসাতে পারব না।
আর আমার নাম্বার তো তোমার কাছে আছেই যখন আমরা একে অপরকে মিছ করব,একে অপরের কথা মনে হবে তখনি আমরা ফোনে কথা বলে নিব।
প্লিজ এখন একটু হাসো, তা না হলে যে আমি শান্তি পাব না।
নিলয়ের কথা শুনে তাসপিয়া খানিকটা হাসার চেষ্টা করল।কিন্তু মন থেকে কান্না চলে আসছে তার।
মনে মনে ভাবছে কেন এমন হল আমার সাথে।আমি নিলয়ের সাথে চলে গেলে যে এই রমযানে মা বিপাকে পরবে।
রান্নাবান্না সহ বাকি কাজগুলা একা করতে গিয়ে হিমসিম খাবে।এই বৃদ্ধ বয়সেই বা আর কত কাজ করবে।তারচেয়ে আর কয়েকদিন সবুর করি,তাতে মায়ের কাজেরও আশান হবে আর দূরে থাকলে আমরা একে অপরকে মিছ করব তাতে আমাদের ভালবাসাটাও বৃদ্ধি পাবে।
আর নিলয়ও তো বলল সে অফিসের কাজের জন্য সামনে সপ্তাহেই চট্টগ্রামে চলে যাবে।
অপেক্ষার ফল যদি মিষ্টি হয়ে থাকে,তাহলে আমি অপেক্ষা করব।মাত্র কয়েকটা দিনই তো।কিছুদিন পরই তো রমজান মাস শুরু, হয়তো আল্লাহ এই এক মাস আমাদের কোন পরিক্ষা নিবে তাই এমনটা ঘটল আমাদের সাথে।
এরকম অনেককিছুই ভাবছে তাসপিয়া, এমন সময় নিলয়ের ডাকে ধ্যান ভাঙল তার।
——– কি হলো,কি ভাবছিলে এত?
তাসপিয়া মন ভোলানো হাসি হেসে বলল—- কই না তো,তেমন কিছু না।
——- দেখ এখন আমিও পরেছি এখন মহা বিপদে, গতকাল রাতেই ম্যানেজার ফোন করে বলল,সামনে সপ্তাহে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীক মিটিং উপস্থিত হতে না পারলে আমাদের কোম্পানির অনেক টাকা লোকসান হয়ে যাবে।তাই আমার অনিচ্ছা সত্তেও সেখানে উপস্থিত হতে হবে।যেখানে না গেলে আমি এই একমাস তোমার সাথে তোমার বাসায়ই থাকতাম।যদিও লোকের কানাঘুষা শুনতে হতো,তবুও আমি তোমার আমার ভালবাসার কাছে পাছের লোকের কথার তোয়াক্কা করতাম না।
তাই এখন মন খারাপ না করে আমাকে হাসি মুখে বিদায় দাও,যাতে করে সবসময় তোমার এই হাসিমাখা মুখটা আমার মনের ভেতর গেথে থাকে আর আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে।
নিলয়ের এমন কথায় তাসপিয়া এবার মন থেকেই হেসে দিল।
তারপর নিলয় আর তাসপিয়া প্রয়োজনীয় কিছু কথাবার্তা বলে বলল।
,
তাসপিয়ার বাসায় থেকে বিদায় নেওয়ার আগ মুহূর্তে নিলয় তাসপিয়াকে কিছুক্ষণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তারপর তাসপিয়ার কপালে চুমু দিয়ে বিদায় নেয়।
,
,
এখন প্রতিদিনই নিলয় আর তাসপিয়ার ফোনালাপ হয়। তাতে করে কিছুটা হলেও একে অপরের ভালবাসাময় অনুভূতিগুলা বুঝার চেষ্টা করে।
,
দেখতে দেখতে রমজান মাস শুরু হয়ে গেল।
রমজান মাসের ১০/১২ তারিখের মধ্যেই নিলয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরবে বলে জানিয়েছে তাসপিয়াকে।
প্রতিদিনই তারাবীহ নামাজের পর নিলয়ের সাথে ফোনে কথা হয় তাসপিয়ার।
নিলয় এখন ঢাকায়ই আছে তার বাসায়।
তাসপিয়া অনেকবার বলেছিল একবার যাতে তাদের বাসায় গিয়ে তাসপিয়ার সাথে দেখা করে নিলয়।
কিন্তু নিলয়ের এক কথা,এতদিন যখন অপেক্ষা করেছ আর মাত্র কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর।তারপরই একেবারে নিজের বাসায় করে নিয়ে আসব।
সেদিন আর কিছুই বলেনি তাসপিয়া। কারন সে অপেক্ষা করতে যানে।
,
আজও তারাবীহ নামাজের পর ফোন দিয়েছে নিলয়।
রিং হচ্ছে কিন্তু ওপাশ থেকে তাসপিয়া ফোন ধরছে না।
কিছুক্ষন রিং হওয়ার পরই ফোন ধরল।
—— কি হইছে তোমার ফোন ধরছ না কেন?
——হ্যালো জামাই বাবা,আমি তাসপিয়ার মা বলছি!
——- জি,আসসালামু আলাইকুম,কেমন আছেন?
—— ওয়ালাইকুম আসসালাম,আলহামদু
লিল্লাহ ভাল আছি,তুমি কেমন আছ বাবা?
—— আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভাল।কিন্তু তাসপিয়া কই,কতবার কল করলাম তবুও ধরল না।
—— আসলে বাবা,ওর একটু শরীর খারাপ,তাই এখন একটু ঘুমাচ্ছে।আমি মাত্রই ওর রুমে এসে দেখলাম তাসপিয়ার ফোন বাজছে তাই ওকে না ডেকে আমিই রিসিভ করলাম।
—— ওও,কিন্তু কি হয়েছে তাসপিয়ার?
—— তেমন কিছু না,ইফতারের পরপরই বল যে মাথা ব্যাথ্যা করছে,সাথে হালকা জ্বরও আছে।
—— ওও আচ্ছা, আমি তাহলে রাখছি এখন।আসসালামু আলাইকুম,বলেই ফোন কেটে দিল নিলয়।
,
,
,
রাত প্রায় ১০ টা বাজে। এমন সময় তাসপিয়ার বাসার কলিংবেল বেজে উঠল।
তাসপিয়ার মা গিয়ে দরজা খুলে দেখল নিলয় চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
নিলয় সালাম দিয়ে তাসপিয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে,তাসপিয়ার মা সালামের জবাব দিয়ে বললেন,তাসপিয়া ওর রুমেই আছে,আমি মাত্রই ওর রুমে থেকে আসলাম।
নিলয় আর কিছু না ভেনে দ্রুত পায়ে তাসপিয়ার রুমের দিকে যেতে লাগল।
,
তাসপিয়ার রুমের কাছে গিয়ে দেখল রুমের দরজা খুলাই আছে।
কোন কিছু না ভেবে রুমে ডুকে তাসপিয়ার পাশে গিয়ে বসে মৃদ্যু স্বরে ডাকতে লাগল নিলয়।
—— তাসপিয়া, এই তাসপিয়া, চোখ খুলো,দেখ আমি এসেছি।কি হয়েছে তোমার?
কয়েকবার ডাক দেওয়ার পরপরই তাসপিয়া আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখল নিলয় তার পাশে বসে তার মাথায় পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
নিলয়কে প্রথমবার দেখে ভুত দেখার মতন করে চমকে উঠল নিলয়।
কাপা কাপা কন্ঠে বলল—— তু,তু…………তুমি,তুমি এখানে এলে কি করে?
নিলয় হালকা হেসে বলল—— কেন, আমি আমার শ্বশুরবাড়ি আসতে পারি না নাকি!
তাসপিয়া উঠে বসতে বসতে বলল—– তা না,কিন্তু এত রাতে তুমি এখানে এলে কি করে?
নিলয় আস্তে আস্তে তাসপিয়ার মায়ের সাথে কথাবলা থেকে শুরু করে এখানে আসা পর্যন্ত সমস্ত কথা বলে দিল তাসপিয়া কে।
তাসপিয়া নিলয়ের কথা শুনে মুচকি হেসে বলল—– বাব্বাহ,এত ভালবাসা আমার জন্য!কিন্তু এত রাতে না এসে কাল সকালে আসলেও তো পারতে?
নিলয় হালকা রেগে গিয়ে বলল—– কই এত রাত, মাত্র তো ১০ টা বাজে,তুমি ঘুমিয়েছিলে বলে তোমার কাছে গভীর রাত মনে হচ্ছে।
ওও বুজেছি আমার আসাতে তুমি খুশি হওনি,তাই না?আচ্ছা আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি(রাগ দেখিয়ে বলল নিলয়)
নিলয় উঠে চলে যাবার জন্য পা বাড়াবে ঠিক তখনি তাসপিয়া নিলয়ের হাত ধরে একটান দিয়ে তার কাছে নিয়ে এসে বিনয়ী কন্ঠে বলল—— প্লিজ যেও না।আমিকি তোমাকে এভাবে বলেছি,সারাদিন রোজা রেখে অফিসের কাজ করো,তাই রাতে তো একটু বিশ্রামের প্রয়োজন, সেই জন্যই তো বলছি যে, এখন না এসে সকালে আসতে।
——- তোমার অসুস্থতায় তোমার পাশে না থেকে আমি বিশ্রাম করব।কখনওই না,আগে তুমি সুস্থ হও তারপরই আমার বিশ্রাম।
জ্বর তো এখন তেমন নেই।
তবুও এই ঔষধগুলা খেয়ে নেও,ইনশাল্লাহ রাতেই জ্বর আর মাথাব্যথা সবই কমে যাবে!
—— তুমি আবার ঔষধ পেলে কই?
——– আরে আসার সময় বাজারের ফার্মেসী থেকে নিয়ে এসেছি,এখন এত কথা না বলে চুপচাপ ঔষধগুলা খেয়ে ঘুমিয়ে পর তো।
নিলয় পাশে থেকে গ্লাসে পানি এনে নিজ হাতে ঔষধ খাইয়ে দিল তাসপিয়াকে।
—— তুমি কি এখনি চলে যাবে?
—— যেতে তো চাইছিলাম,কিন্তু তোমাকে এই অবস্থায় রেখে কি করে যাই বলো?
—— যদি তোমার সমস্যা হয় তাহলে চলে যেতে পার,ইনশাল্লাহ আমার তেমন কোন সমস্যা হবে না।
নিলয় হেসে বলল-তাসপিয়াকে চোখ টিপ মেরে বলল—– কি ভয় পাচ্ছ?ভাবছ রাতে যদি ঘুমের ঘুরে উল্টাপাল্টা করি তাই ভাবছ?
তাসপিয়া চোখ বড় বড় করে বলল—– এই কি বললে তুমি?আমি এটা ভাবতে যাব কোন দুঃখে শুনি।
আমি তোমার স্ত্রী, তাই রাতে উল্টাপাল্টা কিছু করলেও কোন পাপ হবে না বরং আমি যদি তখন তোমাকে বাধা দেই তাহলে ফেরেশতারা আমাকে বদ দোয়া দিবে।
কারন………………রাসুল (সাঃ)বলেছেন—- কোন ব্যক্তি যদি তার স্বীয় স্ত্রী কে বিছানায় ডাকেন,কিন্তু তার স্ত্রী যদি তাতে সাড়া না দেয়ায় স্বামী তার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে রাত কাটায় তাহলে ফেরেশতারা ভোর পর্যন্ত ওই স্ত্রীর প্রতি অভিশাপ বর্ষন করতে থাকে(বুখারী ও মুসলিম)
——– এটা যেহেতু জানো তাহলে এটাও তো জানার কথা যে…………………………যে স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্বামীর সেবা করবে,সে স্ত্রী তার নিজের শরীরের ওজনের সমান সোনা দান সদকা করার সওয়াব পাবে,আর যে স্বামী তার স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তার স্ত্রীর সেবা করবে, সে স্বামী তার নিজের শরীরের ওজনের সমান সোনা সদকা দান করার সওয়াব পাবে(আবু দাঊদ শরীফ)
—— হুম জানি তো।
——- জানোই যখন তাহলে এখনো অসুস্থ শরীর নিয়ে জেগে আছ কেন?তুমি ঘুমাও আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।আর কিছু দরকার হলে আমাকে বইলো আমি সাহায্য করব।
—— তুমিও ঘুমাও আমার সাথে!
——- কেন উল্টাপাল্টা কিছু করার ভয় পাচ্ছ?
*——- ধুর তুমি খুব পচা।আমার মনের কথা কিচ্ছু বুঝ না।তুমি ঘুমাও আমি তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাব তাহলে ঘুমটা তাড়াতাড়ি চলে আসবে।
নিলয় আর কথা না বাড়িয়ে শুয়ে পরল।তাসপিয়াও নিলয়ের বুকে মাথা রাখল।দুজন দুজনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুম রাজ্যে তলিয়ে গেল।
,
,
গভীর রাতে কিছু একটার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তাসপিয়ার…………………
…………………………………………

চলবে ইনশাল্লাহ …………………………………………???

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here