জীবনের_ডায়েরি পার্ট: ২৯

0
383

জীবনের_ডায়েরি পার্ট: ২৯

লেখিকা: সুলতানা তমা

 

–উনি ঘুমাচ্ছেন তাই তো এই সুযোগে আসছি (বলেই আমার কাছে আসতে শুরু করলেন)

মা বলে জোরে চিৎকার দিলাম সাথে সাথে মা সহ সব কাজের লোক আসলো
মা: কি হয়েছে
আমি: (এখন কি বলি এই কথা বললে মা কষ্ট পাবেন আর কাজের লোকের সামনে আমারই সম্মান যাবে)
মা: চুপ হয়ে আছ কেন কি হয়েছে এমন ভাবে চিৎকার দিলা কেন
আমি: মা ওখানে তেলাপোকা ছিল তাই ভয়ে চিৎকার দিয়েছি
মা: পাগলী মেয়ে তেলাপোকা দেখে ভয় পাবার কি আছে ঘুমিয়ে পড়
আমি: মা আমার ভয় করছে নাফিজা আমার কাছে ঘুমাক
মা: ঠিক আছে

সবাই চলে গেলো নাফিজা আর আমি এসে শুয়ে পরলাম
নাফিজা: আপু তুমি কি সত্যি তেলাপোকা দেখে ভয় পেয়েছ
–হুম
–আমার কাছে লুকিয়ে লাভ নেই আমি বুঝতে পেরেছি কারন তোমার রোমে এসে রাকিব কে দেখেছি
–হুম
–এই খচ্চর খালাম্মা কে ভয় পায় না আকাশ ভাই কে একটু ভয় পায় তুমি বরং তোমাদের বাসায় চলে যাও নাহলে অনেক বড় বিপদ হতে পারে
–হুম কালকেই চলে যাবো
–হুম
–আচ্ছা তুমি তো কথা খুব সুন্দর ভাবে বলো মনে হয় শিক্ষিত বাসায় কাজ কর কেন
–একদিন আমাদের সব ছিল আমি যখন ক্লাস টেনে পরি তখন বাবা মারা যান, চাচা সব সম্পত্তি দখল করে নেন এতে মা অসুস্থ হয়ে পরেন তাই মায়ের চিকিৎসা করানোর জন্য বাসায় কাজ করি
–অন্য কাজও তো করতে পারতে
–এই সমাজ খুব নিষ্টুর যেখানে গিয়েছি সবাই শুধু লোভাতুর চোখে থাকিয়েছে শেষ পর্যন্ত এই বাসায় ঠিকানা হলো খালাম্মার জন্য
–হুম

সকালে আকাশ কে ফোন করে সব বললাম ও মা কে ফোনে কি যেন বললো মা এসে বললেন আমাদের বাসায় চলে যেতে, দুপুরে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একাই বাসায় চলে আসলাম, আম্মু অনেক বার জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে উনার সাথে কোনো কথা বললাম না, তুলি এসে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে কিছু দিন থাকবো বলেছি

রাতে রিয়া ফোন দিলো ওকে সব কথা বললাম, ও আকাশদের বাসায় যেতে নিষেধ করলো

দেখতে দেখতে দুই মাস কেটে গেলো, আমি আকাশদের বাসায় যাইনি আমাদের বাসাতেই আছি, রিয়া আকাশ মেঘা আপু আব্বু সবার সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখলাম, আকাশ একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে এখন শুধু ডিভোর্স পেপার এর অপেক্ষা

আজ বিয়ের ছয়মাস পূর্ন হয়েছে, ডিভোর্স পেপার চলে এসেছে, আকাশ ফোন করে উকিলের কাছে যেতে বললো

আমি আব্বুকে ফোন করে বললাম আম্মুকে সাথে নিয়ে বিকেলে যেন আকাশদের বাসায় আসেন, আমি রেডি হয়ে আকাশের দেওয়া ঠিকানায় উকিলের বাসায় গেলাম, গিয়ে দেখি সেখানে আকাশ মেঘা আপু আর মেঘা আপুর আব্বু আম্মু আগেই চলে এসেছেন
আঙ্কেল: কেমন আছ মা
আমি: জ্বী ভালো, আপনারা ভালো আছেন
আন্টি: তুমি যে কাজ করতে যাচ্ছ নিজের মেয়ের কথা ভেবে ভালো লাগছে কিন্তু তোমার কথা ভেবে….
আমি: আন্টি আমি তো খুশি হয়ে ডিভোর্স দিচ্ছি আপনারা ভয় পাচ্ছেন কেন
আঙ্কেল: সত্যি তো মা তুমি খুশি হয়ে দিচ্ছ
আমি: হ্যা আপনারা ভয় পাবেন না
আন্টি: কিন্তু তোমার জীবনটা যে অনিশ্চিত হয়ে যাবে
আমি: আল্লাহ আছেন তো
আঙ্কেল: আমি বুঝতে পারছি না নিজের সুখ কেন বিসর্জন দিচ্ছ মা
আমি: এই সংসারে আমি সুখী হবো না বরং ওদের বিয়ে হলে ওরা সুখী হবে আর তা দেখে আমার ভালো লাগবে প্লিজ আপনারা বাধা দিবেন না
আন্টি: ঠিক আছে মা তোমার যা ভালো মনে হয় করো

তারপর আকাশ আমি দুজন ডিভোর্স পেপারে সাইন করলাম, এখানের জামেলা শেষ করে কাজি অফিসে গেলাম, তারপর মেঘা আপুর আব্বু আম্মু আর আমার সাক্ষীতে ওদের বিয়েটা হয়ে গেলো, সব জামেলা শেষ করতে বিকেল হয়ে গেলো, একটা ট্যাক্সি নিয়ে আকাশদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম

গাড়িতে বসে আছি আঙ্কেল আন্টি চিন্তা করছেন আমার কি হবে আর আমি ভাবছি শ্রাবনের সাথে বিয়েটা হলে আজ এতো কিছু হতো না, দুজন কতো সুখে থাকতাম আমি হতাম পৃথিবীর সেরা ভাগ্যবতী মেয়ে, হঠাৎ আকাশ আর মেঘা আপুর দিকে চোখ পরলো দুজন মন খুলে হাসছে সত্যি দুজন কে খুব সুন্দর মানিয়েছে, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কোনো পাপ করেছি কিন্তু ওদের হাসি দেখে মনে হচ্ছে নাহ কোনো ভুল করিনি দুইটা আত্মা কে এক করে দিয়েছি পাপ হবে কেন

গাড়ি বাসার সামনে এসে থামলো, বাসার ভিতরে ঢুকতে ভয় হচ্ছে বুক ধুকধুক করছে আব্বু মানবেন কিনা ভাবছি তখন রিয়ার ফোন আসলো
–হ্যালো
–কিরে কি করলি
–সব কাজ শেষ বাসায় এসেছি এখন সবাইকে মানাতে পারলেই হলো
–তোর কথা ভেবে এতো দিন না করেছি কিন্তু কাজটা যেহেতু করে ফেলেছিস ভয় পাস না সবাইকে বুঝিয়ে বল আর ভালোবাসার মানুষদের মিলিয়ে দেওয়া ভুল কিছু না
–হুম দেখি কি হয়
–হুম

ফোন রেখে ওদের সাথে নিয়ে বাসায় ঢুকলাম, আব্বু আম্মু রাকিব আকাশের মা সবাই ড্রয়িংরুমে বসা, আকাশকে বর সাজে আর মেঘা আপু কে বউ সাজে দেখেই সবাই বসা থেকে অভাক হয়ে দাড়িয়ে গেলেন
আব্বু: তমা এসব কি
আমি: আব্বু তুমি শান্ত হও বসো আমাদের বসতে দাও সব বলছি
আব্বু: হুম
আম্মু: ওদের বর বউ সাজিয়েছিস কেন
আমি: কারন ওরা বর বউ
মা: মানে

আকাশ আর মেঘা আপু কে সোফায় পাশাপাশি বসালাম, মেঘা আপুর আব্বু আম্মু একটু দূরে গিয়ে বসলেন আমি গিয়ে আব্বুর পাশে বসলাম
আব্বু: তমা কি হচ্ছে এসব
আমি: আব্বু মনে আছে একদিন তোমাকে বলেছিলাম আমি কোনো ভুল করলে ক্ষমা করবা কিনা
আব্বু: হ্যা
আমি: আমি আজ ভুল করেছি, তোমাদের কাছে ভুল মনে হতে পারে কিন্তু আমার কাছে ভুল মনে হচ্ছে না
আব্বু: কি করেছিস
আমি: আকাশকে ডিভোর্স দিয়েছি আর ওদের বিয়ে দিয়েছি
আম্মু: মানে কি
আমি: আম্মু আব্বুর সাথে কথা বলতে দাও তোমার সাথে পরে কথা বলবো
আম্মু: হুম
আমি: আব্বু আকাশ মেঘা আপুকে আর মেঘা আপু আকাশকে ভালবাসে তাই আমি ওদের বিয়ে দিয়েছি
আব্বু: কিন্তু তোর কি হবে
আমি: আমাকে নিয়ে ভেবো না সমাজের মানুষ খারাপ বলবে এটাই তো বলুক তাতে আমার কিছু আসে যায় না শুধু তুমি পাশে থেকো, আব্বু তুমি তো আম্মুকে ভালবেসে পালিয়ে বিয়ে করেছিলে তুমি তো ভালোবাসার মর্ম বুঝ তুমিই বলো আকাশ যখন মেঘা আপুকে ভালবাসে তাহলে কি আমরা সংসার করে সুখী হতাম…? কখনোই হতাম না বরং চারটা জীবন নষ্ট হয়ে যেতো, এখন তো কারো জীবন নষ্ট হলো না আর ওরা দুজন দুজনকে ভালবাসে আজ ওদের বিয়ে হয়েছে দেখো ওরা কতো খুশি ওদের খুশিটা কি কিছুই না, আব্বু প্লিজ তুমি রাগ করো না অন্তত
আব্বু: একটা সত্যি কথা বলবি
আমি: কি
আব্বু: তুই কি কাউকে ভালবাসিস
আমি: (মৃদু হাসলাম)
আব্বু: কাউকে ভালো না বাসলে ভালোবাসার মর্ম বুঝা যায় না আর এতো বড় মহৎ কাজ করা যায় না
আমি: আমি ভেবেছিলাম অনেক বড় ভুল করেছি তুমি রাগ করবা কিন্তু তুমি রাগ করনি তাই আর কাউকে আমি পরোয়া করি না
আম্মু: তুমি ওর এতো বড় ভুল কে মহৎ কাজ বলছ
আব্বু: নিজের স্বামী কে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নিজের জীবন নষ্ট করা অনেক বড় ভুল জানি কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো ও এমন দুজন কে মিলিয়ে দিয়েছে যারা একে অপরকে ভালোবাসে তাই এইটা মহৎ কাজও বলা যায়
আকাশের আম্মু: আমি যে কাজ পারিনি সে কাজ আপনার মেয়ে করেছে আমি তো এতক্ষণ ভয় পাচ্ছিলাম আপনি যদি রেগে যান কিন্তু আমার ধারনা ভুল আপনি যেমন বড় মনের মানুষ আপনার মেয়েও বড় মনের মানুষ
মেঘার আব্বু: আমি নিজেকে অপরাধী ভেবেছিলাম যে কিনা নিজের মেয়ের সুখের জন্য অন্যের মেয়ের সুখ কেড়ে নিয়েছি কিন্তু এখন অপরাধবোধ টা আর নেই আপনার মতো বাবা পাশে থাকলে যে কোনো মেয়ে এমন মহৎ কাজ করতে সাহস পাবে
আব্বু: আমার মেয়ে তো খুশি হয়েই কাজটা করেছে আপনারা অজতা নিজেকে অপরাধী ভাববেন না
আমি: এতো সহজে তোমরা মেনে নিবা ভাবিনি এখন বুঝেছি কাজটা করে ভুল করিনি

আকাশ আর মেঘা আপু এসে সবাইকে সালাম করলো, যাক বাঁচলাম অন্তত আব্বু আর আকাশের আম্মু তো রাগ করেনি, আম্মু আর রাকিব লুইচ্ছা লুচির মতো ফুলতেছে ফুলুক তাতে আমার কি, আমি দুইটা ভালোবাসার মানুষকে মিলিয়ে দিতে পেরেছি এটাই অনেক আমার জন্য তো কেউ ভালোবাসা হারায়নি

আকাশ: আম্মু আমি একটা বাসা নিয়েছি মেঘা আর তোমাকে নিয়ে ওখানেই উঠবো আর আজকেই আমরা চলে যাবো
আকাশের আম্মু: কিন্তু তোর মামা একা…
আকাশ: উনি একা কোথায় উনার কালো টাকার ব্যবসা তো সাথে আছেই

রাকিব লুইচ্ছার দিকে থাকিয়ে দেখলাম রাগে শুধু ফুলতেছে কিছু বলতেও পারতেছে না

সবাই বাসায় যাওয়ার জন্য বেরুলাম, আমরা আমাদের বাসায় আসলাম আর আকাশ ওদের নিয়ে আকাশের নতুন বাসায় গেলো

বাসায় এসে আর কেউ কথা বলিনি আম্মু যে খুব রেগে আছে বুঝা যাচ্ছে কিন্তু আম্মুর তো খুশি হবার কথা উনার সতিনের মেয়ের সংসার ভেঙ্গে গেছে উনি খুশি না হয়ে বরং রাগ হচ্ছেন কেন…?

রাতে রিয়া ফোন করলো, ওকে সব বললাম সবাই মেনে নিয়েছে শুনে রিয়াও খুশি হলো

হয়তো কিছুটা ভুল করেছি নিজের স্বামী কে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে কিন্তু আমরা তো শুধু কাগজে কলমে স্বামী স্ত্রী, কখনো কেউ কাউকে মেনে নিতে পারতাম না কারন দুজনের মনটাই যে অন্য দুজন কে দেওয়া, দুইটা ভালোবাসার মানুষ কে মিলিয়ে দিতে পেরেছি এটা ভেবে অনেক ভালো লাগছে

সকালে আব্বু আম্মুর চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভাঙ্গলো
আম্মু: ওই মেয়ে আমার বাসায় থাকতে পারবে না
আব্বু: এইটা আমার বাসা আমার মেয়ে এখানে থাকবে না তো কোথায় থাকবে
আম্মু: কোনো ডিভোর্সি মেয়ের জায়গা আমার বাসায় নেই নিজের পায়ে তো নিজে কুড়াল মেরেছে এখন আমার মেয়েটা কেও নষ্ট করবে
আব্বু: আমার মেয়ে কোনো অন্যায় করেনি আর ওকে এই বাসা থেকে বের করার কথা আর একবার ভাবলে বাসাটাই আমি ওর নামে লিখে দিব
আম্মু: কি তার মানে ওই অপায়া মেয়েই তোমার সব আমি আর আমার মেয়ে কিছুই না
আব্বু: আমি কি তা বলছি
আম্মু: বুঝেছি সব বুঝেছি ওই অপায়া টাই তোমার সব
আব্বু: বুঝলে ভালো

তারপর সব নীরব, জানি আম্মু আমাকে এই বাসায় থাকতে দিবে না কিন্তু কোথায় যাবো আমি, আমার তো যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই

এক সপ্তাহ কেটে গেলো আব্বু আম্মুর ঝগড়া সারাদিন লেগেই থাকে, আমাকে তাড়িয়ে দিবে এই ভয়ে আব্বু অফিসে যান না, এসব শুনতে আর ভালো লাগে না, আমার জন্য আব্বুকে রোজ রোজ কথা শুনতে হয় তারচেয়ে ভালো এই বাসা ছেড়ে চলে যাই, আল্লাহর দুনিয়ায় কোথাও তো একটু জায়গা হবে

সারাদিন ভেবে ঠিক করলাম এই বাসা থেকে চলেই যাবো অন্তত আব্বু একটু শান্তি পাবে

সন্ধ্যার সময় সবাই যার যার রোমে তখন কয়েকটা কাপড়চোপড়, আব্বুর দেয়া কিছু টাকা, হাতের ফোনটা আর আম্মুর ছবিটা নিয়ে বেরিয়ে পরলাম বাসা থেকে, আব্বুর জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে আসলাম…

আব্বু,
আমাকে খুঁজো নাহ, জানিনা কোথায় যাচ্ছি তবে যেখানেই থাকি তোমার সাথে ফোনে যোগাযোগ করবো, রোজ রোজ আমি অপায়া অলক্ষী এসব শুনতে ভালো লাগে না আর তুমিও তো আমার জন্য এতো কিছু সহ্য করছ তাই বাসা থেকে চলে গেলাম, নিজেকে দোষী ভেবো না কপাল তো আমার খারাপ আম্মু আমাকে রেখে চলে গেছেন আজ আম্মু থাকলে এমন হতো না, প্লিজ আব্বু আমাকে খুঁজো না আমি সবসময় ফোনে যোগাযোগ রাখবো, ভালো থেক….

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here