গল্পটা ৩০০ টাকার

0
440

রুস্তম আলীর এক ছেলে দুই মেয়ে। উনি পেশায় একজন রিক্সা চালক। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে যা আয় হয় তার থেকে ২০০ টাকা দিতে হয় রিক্সা গ্যারেজের মালিককে।রুস্তম আলীর অনেক ইচ্ছা নিজে একটা রিক্সা কিনবেন। সে জন্য তিনি একটা মাটির ব্যাংকও কিনেছেন। সেটাতে এক টাকা দুই টাকা করে যা পারা যায় তাই সে সঞ্চয় করে রাখে।

ঢাকার একটি বস্তী এলাকায় বসবাস তার। ছোট একটি সংসার নিয়ে কোনরকম জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। রুস্তম আলীর ছেলে আনাস মাদ্রাসায় পড়ে।সাথে একটা টিউশনিও করায় তাতে যা টাকা পায় তা দিয়ে কোনরকম নিজের ও ছোট বোনটার পড়ালেখার খরচ হয়ে যায়।

কয়েকদিন পরেই আনাসের পরীক্ষা। সবার কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে ফিস নেওয়া হচ্ছে।কিন্তু আনাস টাকা পাবে কোথায় তার বাবা একজন রিক্সা চালক, যা আয় হয় তাতো পরিবারের খরচ বহনেই শেষ হয়ে যায়। আনাসের মনের মধ্যে এইসব চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।তার এখন কি করণীয়?

আছরের নামাজ পড়ে টিউশনি করার জন্য তাড়াহুড়ো করে মসজিদ থেকে বের হবে আনাস এমন সময় জুতার বাক্সে তাকিয়ে দেখে জুতো নেই।পাগলের মত জুতোগুলো খুঁজতে থাকে আনাস। আজ যদি টিউশনি করাতে দেরী হয়ে যায় তাহলে খুব বিপদ হবে।আগের মাসে দুইদিন অসুস্থ থাকার কারণে যেতে পারেনি সে তাই দুইদিনের বেতন কেটে দিয়েছেন টিউশন বাড়ির সেই ডাইনি মহিলাটা।আর আজকে আনাসের বেতন দেওয়ার কথা ছিল তাই আগে থেকে ঠিক করে রেখেছে বেতনটা পেলেই পরীক্ষার ফিসটা দিয়ে দেব। কিন্তু কিভাবে যাবে জুতোগুলোইতো সে খুঁজে পাচ্ছে না।

কিছুক্ষণপর মসজিদের খাদেম এসে আনাসের কাঁধে হাত রেখে বলল! কি হয়েছে বাবা এভাবে কি খুঁজে বেরাচ্ছ?
–জ্বি আসসালামু আলাইকুম। আসলে আমার জুতোগুলো খুঁজে পাচ্ছি না।
–ওয়ালাইকুম আসসালাম।মনে হয় কেউ নিয়ে গেছে। তুমি আমার সাথে আসো।আমার কাছে কিছু জুতা আছে সেগুলো তোমার পায়ে লাগবে কি না কে জানে। অনেক মানুষ নামাজ পড়তে এসে জুতা রেখে চলে যায়, আমি সেই জুতাগুলো একটা বাক্সে জমা করে রাখি। সেখান থেকে একজোড়া তোমাকে দেব আসো আমার সাথে।

আনাস খাদেমের সাথে মসজিদের দুই তালায় চলে আসলো সেখানে একটা বাক্সে অনেকগুলো জুতো রাখা ছিল। খাদেম বলল!দেখো! তোমার পায়ে কোনটা লাগবে সেটা নিয়ে যাও, আর যদি তোমার জুতা পেয়ে যাও তাহলে এখানের জুতাগুলো এখানে রেখে যেও। এই বলে মসজিদের খাদেম চলে গেল। আনাস সেখান থেকে একজোড়া জুতা নিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে টিউশনির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

অত:পর সেই বাসায় পৌছলো আনাস। সিঁড়ি বেয়ে যখন পাচ তলায় পৌছালো তখন আনাস দেখতে পেল একটা বড় তালা ঝুলে আছে সেই ফ্ল্যাটে।অনেক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাশের ফ্ল্যাট থেকে একজন মহিলা বের হলো, আনাসকে দেখে বলল!আপনি কি এই বাসায় টিউশনি করান?
–জ্বি… হ্যা..
–ওনারা আজকে গ্রামের বাড়ি গেছে। ওনার বাবা নাকি খুব অসুস্থ তাই।
–ও….তা কবে আসতে পারে?
–তাতো বাবা জানি না।
–ও আচ্ছা।

এই বলে মহিলাটা একটা বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলো।আনাসও বিষণ্ণ মন নিয়ে মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।মাগরিব এর আযানের সময় আনাস মাদ্রাসায় পৌছলো।তার অন্যান্য সহপাঠীরা সবাই পরীক্ষার ফিস জমা দিয়ে দিয়েছে।আগামীকালের মধ্যেই পরীক্ষার ফিস জমা দিতে হবে।

টেবিলের সামনে কিছু কিতাব আর বুক চাপা কষ্ট নিয়ে বসে আছে আনাস।এমন সময় আনাসের সামনে হাজির হলো রাতুল। রাতুল আনাসের বন্ধু।

–কিরে ব্যাটা কি হয়েছে সকাল থেকে দেখছি তোর মন খারাপ।
–না রে এমনিই।
–জানি পরীক্ষার ফিস দিতে পারছিস না এই তো। চিন্তা করিস না তোর পরীক্ষার ফিস আমি দিয়ে দেব।
–না না কি বলিস তার দরকার নেই আমিই জোগাড় করে নেব।তুই বলেছিস এটাই বেশি।

রাতুল ভালো করেই জানে এই ব্যাটা কারো কাছ থেকে কানা কড়িও নিবে না। দরকার হলে না খেয়ে থাকবে। তারপরেও কারো কাছে হাত পাতবে না।

আনাস রাতুলকে বলল!আচ্ছা তুই তো সারা ঢাকা টোটো কম্পানির মত ঘুরে বেড়াস তুই কি এমন কোন কাজের খবর জানিস যেটা আমার টাকা জোগাড় করতে সাহায্য করবে।

রাতুল কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল।একটা সলিউশন আছে তবে কাজটা খুব কষ্টের।
আনাস বলল! আরে কষ্টের কথা বাদ দে আগে কাজের কথা বল।
রাতুল বলল!হুম…কামড়াংগি চর লোহার ব্রিজের এখানে একটা ঢাল আছে যেখানে রিক্সাওয়ালারা তাদের রিক্সা উঠাতে খুব কষ্ট হয়ে যায়। তারপর পেছন থেকে যদি কেউ একটু ধাক্কা দিয়ে দেয়। তাহলে তারা তাদেরকে এর বিনিময় ২ টাকা কখনো ৫ টাকা দেয় আবার কেউ কেউ খুশি হয়ে ১০ টাকাও দেয়।

রাতুল কথাগুলো বলে আনাসের দিকে তাকাল, সে আনাসের চোখে কিছু অশ্রু দেখতে পেল যেই অশ্রুটুকু চোখের পাতা ফেললেই গাল বেয়ে পড়বে । রাতুল বলল!কিরে কাঁদছিস কেন?
আনাস বলল!আমি জানি তুইও পরীক্ষার ফিস এভাবে দিয়েছিস।
রাতুল আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেল।

এটাই কিছু ক্বওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের বুক ফাটা কষ্ট। কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা যে কতটা কষ্ট স্বীকার করে তা শুধু তারাই জানে! অনেক মাদ্রাসায় খানা দেয় দু’বেলা। তার উপরে খানার জন্য দিতে হয় লম্বা সিরিয়াল,, কখনো দেড় থেকে দু ঘন্টা শুধু লাইনেই দাড়িয়ে থাকতে হয়! আর খানা কি দিয়ে দেয় জানেন? কখনো শুধু ডাল, কখনো একটা গরু রান্না করা হয়, তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ছাত্রের জন্য, কারো ভাগ্যে গোস্তের টুকরা আসে আবার কারো শুধু ঝোল,,! তবুও ছাত্রদের থাকে না কোন অভিযোগ ,! তবুও তাদেরকে দেখলে কখনো মনেই হবে না এরা এতটা কষ্টে প্রতিটা দিন পার করছে। যে সকল খাদ্য ছাত্ররা খায় আমার বিশ্বাস তা যদি নিজের বাসায় কখনো রান্না করা হতো তাহলে ঘর থেকে না খেয়ে অনেকেই বের হয়ে যেত!

অবশেষে আনাসও রাতুলের পথ অবলম্বন করে পরীক্ষার ফিস দিল। আর আজ সেই আনাস কাতারে একটি মসজিদের ইমাম। বাবা-মাকে নিজের টাকায় হজ্ব করিয়েছে। ছোট দুই বোনকে পড়ালেখা করাচ্ছে। এখন শুধু আনাসের শূণ্যস্থান’টা পূরণ করতে হবে। আই মিন তার একজোড়া কালো চোখ দরকার, দরজা খুললেই যেটা তাকে প্রশান্তি দিবে। একজোড়া লতানো হাত দরকার। দুঃখের প্রহরে যে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা জোগাবে।

=> লেখাঃ নাঈমুল ইসলাম

গল্প টি ভালো লাগলে শেয়ার করে সবাই কে পড়ার সুযোগ করে দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here