গল্পঃ ভাঙন

0
137

গল্পঃ ভাঙন

হাবিবা সরকার হিলা

খবরটা পেলাম দুপুর ১ টায় ৷ মা মারা গেছে। নীতু দুপুরের রান্না সেরে মাকে খাওয়াতে ঘরে ঢুকে দেখে মায়ের হাত-পা নিথর।শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে না, চোখ খোলা।
নীতু ফোনে চিৎকার করে কাঁদছিল।

-ভাইয়া তুই আয়।তাড়াতাড়ি আয়।

-আসব। বড় আপাকে ফোন দিয়েছিস?

-দিয়েছি। আপা আসছে।

-ঠিক আছে। তুই ফোন রাখ। বাবার কাছে যা।

আমি তখন লেগুনায় চাপাচাপি করে আরো ছয়-সাত জনের সাথে বসে আছি৷ লোকজন এই গরমে ভীড়ের মধ্যেও জোরসে আলাপ চালাচ্ছে।ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলছে।কাল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডদের হারে বাংলাদেশের সেমিফাইনালে যাবার সুযোগ খানিকটা এগিয়ে গেল। এবার বিট্টিশরা কিউইদের বিপক্ষে হারলেই হয়। অন্যসময় স্ট্রীট ক্রিকেটবোদ্ধাদের তর্কবির্তক মনোযোগ দিয়ে শুনি। আজ আগ্রহ পাচ্ছি না। মা মারা গেছে।আমার উচিত এক দৌড়ে কমলাপুর স্টেশনে চলে যাওয়া। উপায় নেই। লেগুনার ভাড়া দেওয়ার পর পকেটে থাক পনের টাকা।তৃতীয় শ্রেনীর টিকিট কাটাও যাবে না।টিকিট চেকারের পায়ে পড়ে গেলে কেমন হয়।

-ভাই, আমার মা মারা গেছে।বিশ্বাস না হলে ফোন করে দেখুন।

আনমনে হাসলাম। সকালে সূর্য উঠেছে, দুপুরে মধ্য গননে, সন্ধ্যায় অস্ত যাবে।অফিসযাত্রীরা ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরবে। রাতের খাবার সেরে খানিকক্ষণ টিভি দেখে বউকে নিয়ে শুয়ে পরবে।আমরা ক’জন জেগে থাকব। আমি, নীতু আর বড় আপা।

বাবা ঘুমাবে। কতদিন পর নিজের ঘরে আপন বিছানায় হাতপা ছড়িয়ে আপন করে ঘুমাতে পারবে।মা স্ট্রোক করার পর বাবা হাসপাতালে আসতে চান নি। আমি আর বড় দুলাভাই ছোটাছুটি করে যোগাড়যন্ত্র করছি।বড় আপা চুপিচুপি ডেকে নিয়ে বললেন,

-বাবা আসেন নাই কেন?

-জানিস তো, হাসপাতালে আসলে বাবার বমি হয়ে যায়৷ রোগী রোগী গন্ধ পায়।

-আশ্চর্য। তোদের দুলাভাই কি মনে করবেন! বাবার কোনো কমনসেন্স নাই। নিজের স্ত্রী আইসিউতে ভর্তি তিনি আছেন শুচিবাই নিয়ে।

বাবা শেষপর্যন্ত এলেন। ভ্রুু কুঁচকে মার কেবিনের সামনে পায়চারি করতে করতে লাগলেন।মাকে কোনদিন দেখি নি বাবার মুখে মুখে তর্ক করতে। তরকারি লবন কম হলে, ঝাল বেশি হলে বাবা ভাতের প্লেট ছুঁড়ে ফেলে দিতেন।মা নিজের খাওয়া রেখে ঘর সাফ করা শুরু করতেন। আমি বেকার,নীতু কালো, বড়া আপার জামাই নেশা করে সব ত্রুটির জন্যে কথা শুনতে হত মাকে। মা নীরবে সহ্য করতেন। যেন বাবা শুক্রানু দান করে আপদ বিদায় করেছেন মা পেটে ধরে পাপ করে ফেলেছেন। প্যারালাইজ হয়ে মা বিছানায় ছিলেন আড়াই বছরের কিছু বেশি।বাবা একঘরে থাকতেন। ঝড় হোক,বৃষ্টি হোক, বারান্দায় শুয়ে থাকতেন।রোজ সকালে ফজর নামাজ শেষে মায়ের মাথার কাছে এসে দাঁড়াতেন।

-কেমন আছ?

-ভালো আছি।আপনার শরীরটা কেমন?

-ভালো আছি। ঔষুধপত্র খাচ্ছ তো ঠিকমত?

-খাচ্ছি।

বাবার এই মহানুভবতায় মা কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়তেন।বাবা পাঁচ মিনিটের বেশি দাঁড়াতেন না। রোগী রোগী গন্ধ পান।বাবা আজ ঘুমাবে। ঘরের ভেতর রোগীর গন্ধ আড়াই বছর স্থায়ী হয়েছিল লাশের গন্ধ আড়াই ঘণ্টাও না।

নীতুটারও ঘুমানো উচিত। মেয়েটা ক্লান্ত ভীষণ। ঘরের যাবতীয় সব কাজ করা, মাকে খাওয়ানো,গোসল করানো, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া আরো কত কাজ। মেয়েটা বয়সে আমাদের সবার চেয়ে ছোট, সবচেয়ে আদরের। অথচ ওর উপর সবচেয়ে ধকল গেল। ভাইবোনদের মধ্যে ওর মাথাটা খাসা৷ এস.এস.সির রেজাল্টের পর ডিসি স্যার ডেকে নিয়ে মেডেল দিয়েছিলেন।সাথে পাঁচ হাজার টাকা। মা জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন,

-আমার এই মেয়েকে ব্যারিস্টারি পড়াব। ওর ভীষণ বুদ্ধি।

নীতু এইচ.এস.সির জন্যে খাটছিল খুব।ভালো রেজাল্ট করতে হবে।টেস্টের পর নীতুকে বলেছিলাম,

-চল তোকে লালবাগ কেল্লা,আহসান মঞ্জিল দেখিয়ে আনি৷ তোর অনেকদিনের ঢাকা ঘোরার শখ।

-পরীক্ষার পর কোচিং করতে যাব।তখন সব ঘুরিয়ে দেখাস।

বাগড়া দিলেন মা৷ নীতুর এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন স্ট্রোক হয়ে গেল। নীতুর পরীক্ষা দেওয়া হল ঠিকই আশানুরূপ রেজাল্ট আর হল না।

তারপর থেকে মায়ের ঘর আর রান্নাঘর করতে করতে নীতুর দিন যায়। গ্রামের কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে আছে ঠিকই ক্লাস করার সুযোগ কই।
ঘটক আসলে বাবা দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন,
তার মেয়ে ছোট, আরো পড়বে।

রান্নাঘরের হেঁসেল সামলে আর রোগীর সেবা করে নীতুর পড়াটা আর হয়ে উঠছে না।ঈদের সময় বাড়ি গিয়ে দেখেছিলাম মায়ের চেয়ে নীতুর মুখচোখ আরো শুকনো। চোখের নীচে কালি। স্বপ্নগুলো মরে গেলে মানুষটাও মরে যায়। দুঃখ এই, আমরা এই মরে যাওয়াটা চোখে দেখি না।

বড় আপা কাঁদতে পারে খুব।ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদবে সারারাত। দুলাভাই বড় আপার পাশে কিছুক্ষণ বসে উঠে যাবে।বেচারা সিগারেট ছাড়া বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। ছোটবেলায় আলমারি থেকে দশ টাকা-বিশ টাকা চুরি করে বড় আপার নাম দিতাম। মা বড় আপার পিঠে দু’চার ঘা কিল বসালেও আপা চুপ থাকত। গাল বেয়ে অঝোরে জল গড়াত। আপা জানত আমার দোষ আমার তবু আদরের ভাইয় বলে নিজের ঘাড়ে মাথা পেতে নিত।

মায়ের অসুখের পর সমস্ত খরচ বড় আপা যোগাত।আপা গৃহিণী, স্বামীর প্রচুর টাকা আছে ঠিকই কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে বউ হিসেবে কতৃর্ত্ব নেই। গরীব ঘরের মেয়ে যা হয়।তবু কি করে এত খরচ চালাত তা এক রহস্য বটে।রহস্য উন্মোচন হল কিছুদিন আগে।বাবাকে কল করে দুলাভাই ধমকাল,

-আপনার মেয়েকে নিয়ে যান।চোর মহিলার সাথে সংসার করা সম্ভব না।ফকিরনীর বাচ্চা।জীবনে এত টাকা চক্ষে দেখছে নাকি!স্বামীর পকেট থেকে টাকা সরায়।

আপাকে আর চুরি করতে হবে না।

মায়ের অসুখে সবচেয়ে লাভ হয়েছিল আমার। বাড়ি গেলেই মা তোশকের নীচ থেকে পাঁচশ -এক হাজার টাকা বের করে দিত।যে ছেলে মাস্টার্স পাস করে তিন বছর ধরে বেকার ঘুরছে,চাকুরি পায় না সে ছেলের প্রতি তার স্নেহের অন্ত নেই। আসলে মায়েরা পক্ষপাতী করে,ছেলের পাল্লা সবসময় ভারী থাকে।

সেই মা অসময়ে মরে বিপদে ফেলে গেল। ২৬ তারিখ, মাসের শেষ। পকেট একদম খালি। মেসে মিলের টাকা দেওয়া আছে।না খেয়ে মরতে হবে না,এই যা।কিন্তু বাড়ি যেতে হলে পকেটে অন্তত তিনশ খানেক টাকা প্রয়োজন। মৃত মায়ের মুখটা শেষবার দেখতে হলেও টাকা দরকার হয় একেই বলে বাস্তবতা।

গলাটা শাসাচ্ছিল খুব। এক গ্লাস লেবুর শরবত খেলাম পাঁচ টাকা। যাহা পনের তাহাই দশ টাকা । ক্ষতি কি!

বড় আপার ফোন। ইশ! এজন্যি বড় বোন মায়ের কাজ দেয়। রিসিভ করলাম,

কাঁদছে ভীষণ।এত কাঁদছে নাক টানা ছাড়া আর ওর কোনো কথাই বুঝতে পারছিলাম না। ওকে ধাতস্থ হবার খানিকটা সময় দিয়ে বললাম,

-আপা, পাঁচশ টাকা বিকাশ করবি? বাড়ি যাবার পয়সা নেই।

#গল্পঃ ভাঙন

হাবিবা সরকার হিলা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here