খাঁটি ভালোবাসা

1
467

— এই রিক্সা যাবেন?
— কই যাবেন ভাই?
— ঈশ্বরদী, ব্রিজের ওখানে।
— হ যামু। কিন্তু ভাড়া একটু বাড়ায়ে দেয়া লাগবে।
— কত?
–তিনশো টেহা।
–আচ্ছা ঠিক আছে চলেন।
–ওঠেন।

ফাহিম আর মিরা রিক্সায় উঠে বসতেই রিক্সাওয়ালা ইয়াছিন রিক্সা চালাতে শুরু করলো। ভাড়াটা যে তেমন বেশি চেয়েছে তাও না। পাবনা থেকে ঈশ্বরদী অনেকটা পথ। সেখানে রিক্সায় তিনশো টাকা অতটাও বেশি লাগেনি ফাহিমের।

ইয়াছিন কথায় কথায় বললো,
— তা ভাইজান আপনারা এত সাজগোজ কইরা ঈশ্বরদী কেন যাচ্ছেন? দাওয়াত টাওয়াত আছে নাকি?
— না ভাই, কোন দাওয়াত টাওয়াত নাই। আজ তো বিশেষ একটা দিন।
— বিশেষ দিন! সেইডা কেমন?
— আরে ভাই, আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি মানে ভালোবাসা দিবস। এই দিনে সবাই সবার ভালোবাসার মানুষরে নিয়ে ঘুরতে বের হয় আর লাল গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করে।
— সব তো একদম মুখস্থ করে রেখেছো কিন্তু আমার গোলাপ কই? পাশ থেকে মিরা বললো।
–এই যাহ, ভুলে গেছি একদম। সমস্যা নেই ওখানে গিয়ে কিনবো।

ইয়াছিন মূর্খ একজন রিক্সা চালক। ওর মাথায় কিছুতেই এই ভালোবাসা দিবস, প্রপোজ এসবের অর্থ আসছেই না। তবে বিষয়টা নিয়ে সারা পথ খুব কৌতূহল নিয়েই এসেছে।

ঘন্টা দু’য়েক পর ওরা ঈশ্বরদী এসে পৌঁছায়। ফাহিম ইয়াছিনকে ভাড়া মিটিয়ে দিলেও ইয়াছিন আর অন্য কোথাও গেল না। ও রিক্সা নিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। উদ্দেশ্য হলো, ফাহিম আর মিরা কি করে তা দেখার। ভালোবাসা দিবস, প্রপোজ এসবের মানে বুঝতে চায় ইয়াছিন।

ইয়াছিন লক্ষ্য করে দেখলো ফাহিম আর মিরার মত অনেকেই এসেছে। সবার হাতেই গোলাপ ফুল। ইয়াছিনের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

কিছু সময় পর ইয়াছিন দেখলো, ফাহিম একটা গোলাপ ফুল কিনে এনে মিরাকে হাঁটু গেরে বসে বলছে,
মিরা, তোমাকে প্রথম দিন থেকেই খুব ভালোবাসি আর এভাবেই জীবনের শেষ অবধি বাসতে চাই। আই লাভ য়্যু মিরা।
ইয়াছিন দেখলো মিরা লজ্জায় লাল হয়ে ফাহিমের থেকে ফুলটা নিলো। তারপর দু’জনে হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলো।

কেন জানি বিষয়টা মনের ভেতর গেথে যায় ইয়াছিনের। ফেরার পথে আনমনে রিক্সা চালায় আর ভাবে, এটাই বুঝি ভালোবাসা? এটাই কি প্রপোজ?

পাবনা ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। পাবনা এসেই ইয়াছিন একশো টাকা দিয়ে একটা গোলাপ ফুল কেনে। যদিও দামটা ওর জন্য অনেক তবুও কেনে৷ অজানা এক অনুভূতি ওর পুরো শরীরটা শিউরে দিয়ে যায়। ইয়াছিন রিক্সা মালিকের গ্যারেজে রেখে বাড়ি ফেরে। দেখে ওর বউ রান্না চুলায় বসিয়েছে৷ ইয়াছিন ভয়ে ভয়ে বলে,
— সালমা?
— কি কইবেন?
— একটু শুইনা যাও তো।
সালমা চুলার পাশ থেকে বিরক্ত ভরা ঘর্মাক্ত মুখটা আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে উঠে এসে বলে,
— কি কইবেন জলদি কন তরকারি কাটা লাগবে।

ইয়াছিন লুঙ্গির আড়াল থেকে কেনা গোলাপটা বের করে হাঁটু গেরে বসে ভয়, লজ্জা আর আনকোরা ভাবেই বলে,
— বিয়ার পর থেইক্কা তোমারে কিছু দিবার পারি নাই। গরিবের ঘরে দুই মুঠ ভাতই তো পাওয়া যায় না। তয় আমি তোমারে খুব ভালোবাসি। শুনলাম আজ নাকি ভালোবাসা দিবস। এই দিন সবাই তাদের ভালোবাসার মানুষরে ফুল দেয়। তাই আমিও দিলাম।
সালমা নিজেও বুঝেনি এসবের মানে কি। হঠাৎ করে কেন সে এমন করলো। তবে স্বামীর মুখে এভাবে প্রথমবার ভালোবাসি শুনে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো সালমার। ফুলটা হাতে নিয়ে লজ্জা আর অভিমানের সুরে বললো,
— ফুল কিনতে টেহা লাগে না? গরিব হইয়া ঢং ধরছেন, রং লাগছে মনে?
— লাগছে কি না জানি না। তয় আমার মনে যে সুখ লাগছে তা এই টেহার কাছে কিচ্ছু না। তুমি কি খুশি হও নাই?
— হইছি তো।

ইয়াছিন সালমার হাত ধরে বলে,
— তাড়াতাড়ি রান্না শ্যাষ কইরা বিয়ের সময়ের কেনা কাপড়ডা পইড়া লও। আমি তোমারে লইয়া আর ঘুরমু।
— আপনি কি পাগল হইছেন?
— হইলে হইছি।
— লোকে কি কইবো?
— লোকের কথায় কাম কি৷ তুমি যাও তো তাড়াতাড়ি রান্না শ্যাষ করো।

সালমা চুপচাপ চলে যায়। তবে ওর ভিতরে অজানা এক ভালো লাগার বিশাল ঢেউ বয়ে যায়।

রাত প্রায় আটটা বাজে। ইয়াছিন রিক্সা চালাচ্ছে আর পেছনে চুপচাপ বসে আছে সালমা। সব কিছু ওর কাছে হঠাৎই কেন যেন সুখের মনে হচ্ছে। যেন এত সুখ সে জীবনে কোনদিন পায়নি।

হোক না ইয়াছিন গরিব, রিক্সাওয়ালা, তাই বলে কি ভালোবাসায় ভাটা পড়বে?
ওদের ভালোবাসা না হয় ভিন্ন ধাঁচে বানানো। তবুও, ভালোবাসা দিবসের জন্যে হলেও তারা যে সুখ পেল তা দিয়ে না’হয় আর কটা দিন চলবে।

গল্প না এটা। মাস কয়েক আগে আমার বন্ধু বলেছিল কাহিনীটা। তাও আবার ওর বাবা-মায়ের গল্প। বলে খুব লজ্জা পাচ্ছিল ও। আর বারবার বলছিল যেন আমি এটা আবার গল্প আকারে লিখে না ফেলি। তবে আমার কাছে এই দিবসের জন্যে এর’চে ভাল খাঁটি ভালোবাসার গল্প আর নেই।

=> লেখকঃ আসিফ আহমেদ

ভালো লাগলে শেয়ার করে সবাইকে পড়ার সুযোগ করে দিন

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here