এক অভিমানীর গল্প পর্ব- ০৭

এক অভিমানীর গল্প
পর্ব- ০৭
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

মাগরিবের নামাজ পড়ে সন্ধ্যার পর পরই আবারো কল দেয় মায়া। বাঁধনের ফোন তখনো বন্ধ। অভিমানী মায়া মন খারাপ করে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
গেইট’টা আস্তে করে ফাঁক করে বাসায় ঢুকে সুমি। সুমি মায়ার কাজিন। বয়সে মায়া সুমির থেকে বছর দুয়েক বড় হলেও, তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। বাঁধনের সাথে রিলেশন চলাকালীন সময়ে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়গুলোও মায়া বোন সুমির সাথে শেয়ার করত। ওদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে সুমি তা সমাধানের প্রাণপন চেষ্টা করত। কখনো বা রাগী মায়াকে বিভিন্ন কৌশলে সুমি কন্ট্রোল করত, বাঁধনের সাথে কথা বলিয়ে দিত। তাই সুমিকে মায়ার মন খারাপের সাথী বললেও খুব একটা ভুল হবে না।
ওহ, হ্যাঁ! যে কথাটি বলছিলাম___
মন খারাপ করে বারান্দার রেলিং ধরে চুপসে দাঁড়িয়ে ছিল মায়া। পিছন থেকে সুমি হাত রাখে মায়ার কাঁধে। কিছুটা চমকে পিছনে তাকায় মায়া।
” ওহ, সুমি আপু?!!!”
— অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়েছিলাম, মন খারাপ???
” কই?! নাতো!!!”
—— বাহ্! আমার বোনটা তো দেখছি বেশ বড় হয়ে গেছে।
জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে সুমির দিকে একবার তাকালে মায়া। সুমি ঠোঁটের কোণে মলিন হাসির রেখা টেনে বলল, খুব কথা লুকানো শিখে গেছিস, তাই না?
সুমির প্রশ্নে মাথা নিচু করে ফেলে মায়া।
হঠাৎ’ই বৃষ্টি পরা শুরু করে। বাহিরে হাতটা বাড়িয়ে দেয় মায়া। পূর্বেকার মতই বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা মায়ার হাতে এসে পরতেই হাঁচি শুরু হয়ে যায় মায়ার। একটানে সুমি মায়াকে রুমে নিয়ে যায়। রুমে খাটে বসিয়ে সুমি ওর ওড়না দিয়ে মায়ার হাতে লেগে থাকা বৃষ্টির পানিগুলো মুছে দিচ্ছে। মায়া ঢ্যাবঢ্যাব চোখে কাজিন সুমির দিকে তাকিয়ে আছে।
—- এভাবে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে থাকলে হবে না। মন খারাপের কারণ জানতে চাই আমি। কি হয়েছে সেটা শুনতে চাই আমি। আমি জানতে চাই, আমার বোনটার চোখে কে অশ্রু জড়িয়েছে?
কাজিনের আহ্লাদমাখা কথা শুনে আহ্লাদী মায়া চোখের পানি ছেড়ে দেয়। এখন শুধু ঠোঁট বাকাতে বাকি।
—– বল, কি হয়েছে?
কাঁদো কাঁদো গলায় মায়ার জবাব, ও আমার সাথে রাগ করে মামার বিয়ে না খেয়েই সকালে চলে গেছে। ও বাড়ির সবাই এজন্য আমায় খুব বকেছে…..
—– কল দিসনি পরে?
— দিয়েছিলাম, কিন্তু ফোন বন্ধ;
—— পাগলী মেয়ে! এইজন্য এত কান্না করা লাগে? হতে পারে ওর ফোনে চার্জ নেই কিংবা ফোন বন্ধ করে ভাইয়া হয়তো নামাজ পরতে গেছে।

সুমির কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য চুপ হলেও বেশীক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে পারেনি মায়া। ওর ধারণা, বোকা মায়াকে কিছু শান্ত্বনার বাণী দিয়ে সুমি শুধু চুপ করিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাঁধন ওর সাথে রাগ করেই ফোন বন্ধ করে রেখেছে।
রাত্রি ১১টা বেজে ১৯মিনিট তখন। এরই মধ্যে কয়েকশত বার ট্রাই করে ফেলেছে মায়া। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। আবারো কল দেয় মায়া। এবার আর মন খারাপ করে ফোনটা কান থেকে নামাতে হয়নি। এবার রিং বাজছে। রিং বেজে একবার আপনাআপনি কেটে যায়, কেউ কল রিসিভ করেনি। মায়া আবারো কল দেয়। এবার ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হয়। গভীর উৎকন্ঠার সাথে মায়া “হ্যালো” বলে উঠে।
—– কিছু বলবে?

না মানে আপনি আসলে আপনি কি…. (…)…???
এভাবে আমতাআমতা কেন করছ? কিছু বললে তাড়াতাড়ি বলো, আমি ঘুমাবো। অনেকটা বিরক্তিকর স্বরে বাঁধন কথাগুলো বলল। নরম স্বরে মায়ার প্রশ্ন, খুব ঘুম পাচ্ছে?
—– হুম। খুব ক্লান্ত আমি…..
– ঠিক আছে, ঘুমান তাহলে।
—— রাখি….
– এই শুনোন……
——- কি?
– খেয়েছ রাত্রে???
——–……….
– স্যরি, খেয়েছেন?
—– প্রশ্নোত্তর কোনো কথা বলেনি বাঁধন। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কলটা কেটে দেয়।

সারারাত্রিতে একটাবারের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেনি মায়া। শেষ রাত্রিতে বাঁধনের ফোনে আবারো কল দেয় মায়া। কলটা রিসিভ করে বাঁধন। কাঁপা কাঁপা গলায় “সালাম” দেয় মায়া। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বাঁধন সালামের জবাব দিয়ে বলে, কিছু বলবে?
——ফজর নামাজের সময় হয়েছে। উঠে পরুন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে আজান দিবে।
– ওকে।
——- আচ্ছা, রাখি তাহলে।
– ওকে।
——- মায়া কলটা কেটে ফোনটা বালিশের নিচে রেখে একটা বালিশকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট বাকিয়ে কান্না করতে থাকে। তারপর কান্না করতে করতেই ঘুমিয়ে পরে।

সকাল ৮টা কি সাড়ে ৮টা বাজে তখন,
ও বাড়ি থেকে মায়ার মা-ও চলে এসেছে মায়ার পরীক্ষা আছে বলে। রান্না করে মায়ার মা মায়াকে ডাক দেয়। ঘুম জড়ানো কন্ঠে মায়ার জবাব, খুব কাশি পাচ্ছে। একটু পর উঠছি মা। এখন আর ডেকো না। কারণ, কথা বললেই আমার কাশি উঠে, আর কাশি দিলে বুকে ব্যথা পাই।
মায়ার মা চলে গেল। বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে ভেঁজা ভেঁজা চোখে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে মায়া। এতবেলা হয়ে গেল একটা কলও দেয়নি বাঁধন। অথচ আগে তো বাঁধন…..(…..)…??? ভাবতেই জলে ভরে যায় চোখ।
ফেসবুকে গিয়েও বেশীক্ষণ টিকতে পারেনি মায়া, চলে আসে ফেসবুক থেকে। সকাল ১১টার দিকে রওয়ানা দেয় পরীক্ষা কেন্দ্রের দিকে। বিকেলের দিকে বাসায় ফিরেও আবারো চাতকের ন্যায় ফোনের স্ক্রিনের দিকে একটি ফোন কলের আশায় চেয়ে থাকা। বাঁধন আর কল করে না। রাত্রেও বাঁধনের একটা কলের আশায় বসে থাকত মায়া, কিন্তু বাঁধনটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। আগের মত আর মায়াকে কল দিয়ে বিরক্ত করত না। তিনবেলা খাওয়ার আগে কল এসএমএস করে বলত না, লক্ষ্মী! খেয়ে নাও কিংবা খেয়ে বিকেলের দিকে পুকুরপাড়ে ঘুরতে যেও কিংবা গোসল করে একটু ঘুমিও। এখন আর ভরা জোৎস্নাতে বাঁধন মায়াকে বিরক্ত করে না।
ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বলে না-
লক্ষ্মী! বাইরে দেখো কি সুন্দর চাঁদ কিংবা জানালাটা খুলে দাও, চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে যাবে তোমার ঘর। অনেক রাত ভর ফেসবুকে থাকলে এখন আর কেউ ধমক দিয়ে বলে না, রাত হয়েছে অনেকটা। ঘুমাতে যাও……

বাঁধনবিহীন মায়ার দিনগুলো এভাবেই কাটছিল।

সেদিন ছিল মায়ার পরীক্ষার শেষের দিন। পরীক্ষা হলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে মায়ার বাসা থেকে কল আসে। মায়া ওর বোন মারফত জানতে পারে, বাঁধনের মা মানে ওর শাশুড়ি মা খুব অসুস্থ্য। ৪ঘন্টার পরীক্ষা ১ঘন্টায় দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যায় মায়া।
মায়া গাড়িতে উঠে গেছে।
গন্তব্যস্থল- শ্বশুর বাড়ি।
ঘন্টা তিনেকের মধ্যে মায়া বাঁধনের গ্রামে উপস্থিত হয়। কিন্তু সমস্যা একটাই। ওর শ্বশুরবাড়ি যে ঠিক কোনটা মায়া সেটাই বুঝতে পারছে না। বিশাল বড় গ্রামের পুরোটা ঘুরে ফিরে একটা পুকুরপাড় গিয়ে হাজির হয় মায়া। কল করে বাঁধনকে। প্রতিবারের মত এবারো বাঁধনের জবাব,
এই অসুস্থ শরীরে তুমি আমার গ্রামে চলে আসছ, এটা তুমি বলছ আর আমি বিশ্বাস করব, ভাবলে কিভাবে? বহু অনুনয় বিণয়ের পরও মায়া পারেনি বাঁধনকে বিশ্বাস করাতে ও মজা নয়, সত্যিই এসেছে ওদের গ্রামে।
কলটা কেটে দেওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের দিকে তাকায় মায়া। অনেকগুলো পিচ্চি পুকুরে ঝাপ দিচ্ছে আর খেলছে। মায়া ওদেরকেই ডাক দিল। হাসি হাসি মুখে ভেঁজা শরীরে একটা পিচ্চি ছুটে আসল মায়ার দিকে।
” কা…..কী….(…….)….????”
পিচ্চিটার পুরো কথা শুনার মত টাইম মায়ার কাছে ছিল না। গম্ভীর কন্ঠে মায়া প্রশ্ন করে, বাঁধন বলে এই গ্রামে একটা ডাক্তার আছে। তুমি চিনো ওর বাড়ি???
মায়ার প্রশ্নের জবাবে পিচ্চিটা হাসি দিল। আর ঐভাবে হাসতে হাসতেই পুকুরের পানিতে ঝাপ দিল। মায়া পিছু পিছু পুকুরপাড়ের ঐ স্থানটাই যায়। প্রশ্ন করে আবারো- ঐ পিচ্চি, বলো না। আমি আসলে ওনার বাড়ি চিনি না।
পিচ্চিটা হাসতে হাসতে বলে, এ্যা, মিছা কথা কয়। চিনে না বলে…..!!!
ব্যর্থ হয়ে মায়া ফিরে যায় পিছনে ফেলে আসা বাজারটাই। ততক্ষণে প্রচন্ড খিদে পেয়েছে ওর। মায়া আবারো ঐ হোটেলে ঢুকে, যে হোটেল থেকে মিনিট ত্রিশেক আগেও খেয়ে গিয়েছিল। নাহ! এবার আর ভাজিভুজি খেতে বসেনি মায়া, এবার ভাতের অর্ডার দিয়েছে। ভাতের প্লেট সামনে এনে রাখতেই মায়া নাক ছিটকায় উঠে দাঁড়ায়। তারপর অত্যন্ত নরম স্বরে বলে, আংকেল! ভর্তা নেই কোনো??? আসলে জার্নি করে আসছি তো, কেমন যেন বমি বমি লাগছে। ঝাল জাতীয় কোনো কিছু মানে ভর্তা হলে ভালো হতো।
—— মা, আমার হোটেলে তো কোনো ভর্তা নেই। ভর্তার হোটেল তো ঐযে সামনেরটা।
মায়া সামনের হোটেলের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর নিচু গলায় বলে, আসলে আংকেল! ঐ হোটেলে অনেকগুলো ছেলের শব্দ শুনছিলাম, তাই যায় নি।
——– এখন এই ভাত তো ফেলে দিতে হবে।

মায়া মনে মনে ভাবে, আমার কারণে লোকটার লস হবে? না, না! খেয়েই নেই। একদিনই তো। খেলে কিচ্ছু হবে না। সাত পাঁচ ভেবে মায়া ওর হাতটা ধূয়ে প্লেটটা নিয়ে যখন বসতে যাবে, তখনি বয়স্ক লোকটা একটা বাটিতে করে কয়েক রকমের ভর্তা নিয়ে হাজির। মায়া একবার ভর্তা তো আরেকবার ঐ বয়স্ক লোক মানে হোটেল মালিকের দিকে তাকাচ্ছে। লোকটা মৃদু হাসি দিয়ে বলে, দাও মা! তোমাকে আরেক প্লেট ভাত এনে দেই।
মায়া কিছু না বলে প্লেটটা লোকটার দিকে এগিয়ে দেয়। লোকটা ঐ প্লেটটা রেখে আরেকটা প্লেটে ভাত নিয়ে হাজির হয়।
মায়া লোকটার দিকে তাকিয়ে একটা কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে ভর্তা দিয়ে পরম তৃপ্তিতে ভাত খেতে শুরু করে।
এদিকে বাঁধন?!!!
হোটেলে বন্ধুদের সাথে বসেছিল খেতে। খেতে বসে মোবাইলে গুঁতাগুঁতি করা ওর চিরাচরিত অভ্যাস। ডাটা চালু করতেই মেসেঞ্জারে টুংটাং শব্দে কতগুলো মেসেজ আসে। মেসেজ চেক করতে গিয়ে বাঁধনের চক্ষু চরকগাছ। মায়ার এক ফ্রেন্ড মেসেজ দিয়ে বলল, মায়া এই মুহূর্তে ওদের বাজারে কোনোএক হোটেলেই আছে। কিসের খাওয়া, কিসের কি?!!!
বাঁধনসহ ওর বন্ধুরা পুরো বাজার জুড়ে ঘুরতে থাকে আর হোটেলে হোটেলে মায়াকে খুঁজতে থাকে। সবশেষে বাঁধন আসে ওর আপন ছোট চাচার দোকানে।
——— আয়! বস…. খেয়ে যা……
— কাকা, শফিক ভাই বলল তুমি নাকি আমার ভর্তার বাটি নিয়ে আসছ?ব্যাপার কি???
——– আস্তে কথা বল, একটা মাইয়্যা। মাংস খায় না। ওর জন্য আনছি। তোকে পাইনি, তাই শফিক বলল নিয়ে আইতে।
–……….
——— আয়, হোটেলের ভিতরে আয়!
— আচ্ছা, কাকা! সাদা কলেজ ড্রেস পরিহিত, কোনো মেয়ে কি তোমার এখানে আসছিল???
——- সাদা?!! শুকনো করে একটা মেয়ে! হ্যা, আইছিল তো।
— কাকা, ও কোনদিকে গেছে জানো???
——- এই মেয়ের জন্যই তো ভর্তা আনলাম।ভেতরে, খাচ্ছে।

কোনো কথা না বলে রীতিমত একটা লাফ দিয়ে বাঁধন ভিতরে ঢুকে। অনেকদিন পর তৃপ্তিসহকারে প্লেটের সবকয়টা ভাত খেয়ে ফেলেছে মায়া। হাত ধূয়ে একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে টেবিলে রাখা পার্সটা থেকে টাকা বের করতে যাচ্ছিল মায়া, তখনি সামনে থেকে কেউ একজন বলে উঠে,
” আরেক প্লেট দেই?”
——– না, আং……(…..)….????
— ???
——– আ আ আপনি???
— ????

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here