একটি পানকৌড়ির গল্প…..  পর্ব –৪. 

0
2290
 একটি পানকৌড়ির গল্প…..
পর্ব –৪.
আফতাব হোসেন বিব্রতবোধ করছেন। ছোট্ট একটা প্রশ্নে মানুষের কতো বড় আর বিষাদের অতীত প্রকাশ পেয়ে যায় আজকে তিনি বুঝতে পারলেন। প্রিয় মানুষের হারিয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে কেউই মেনে নিতে চায়না। হয়তোবা সময়ের স্রোতে অনাদিকালের নিয়মকে বাঁচিয়ে রাখতে পথ চলতে হয়। আসলে পথ চলতে হয় বেঁচে আছে তাই। সবাই খুব সহজে নিজেকে ধ্বংস করে দিতে পারেনা। নিজেকে ধ্বংস করার ক্ষমতা সবার থাকেনা।
আফতাব হোসেন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ৭ টা বেজে ৪০ মিনিট। কতো দ্রুত সময় বয়ে চলেছে।
রেহানা বেগম নাস্তার ট্রে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকলেন। রশীদ আলমের সামনে রাখা ছোট্ট টি টেবিলে নাস্তার ট্রে রেখে চলে গেলেন। ভদ্রলোক কাঁদছেন ব্যাপারটা তার কাছে স্বাভাবিক মনে হলো। মানসিক ডাক্তারের কাছে কেউই সুখে থাকতে আসেনা।মনের বিশাল সমুদ্রের ন্যায় রোগ গুলোকে জমিয়ে আনে।
আফতাব হোসেন বললেন
– নাস্তা খেয়ে নিন। তারপরে না হয় আবার শুরু করা যাবে।
রশীদ আলম নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন
– এতো কিছুর দরকার ছিলোনা। সামান্য চায়ে হতো।
– সামান্য নাস্তা দিয়েছি। পাকোড়া, নুডুলস আর র চা। খান তো আপনি।
আফতাব হোসেন নিজের জন্য আনা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তার লেখাগুলো পড়ছিলেন। কোথাও কোনো সমস্যা খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে লেখাগুলো বারবার পড়ছিলেন।
– আপনার স্ত্রী চলে যাবার পর তার দেখাশোনা কে করেন?
– আমার মা।
– তিনি মানুষটা কেমন? আপনি তো তার ছেলে আপনি ভালোভাবেই মা সম্পর্কে বলতে পারবেন।
– মা তো ভালোই হয়।
– আপনার স্ত্রীকে পছন্দ করতেন? বউ – শ্বাশুড়ির সম্পর্ক কেমন ছিলো?
– মা তেমন পছন্দ করতেন না। স্বাভাবিকভাবেই সম্পর্কও তেমন ভালো ছিলোনা।
– আপনার মা কি কুসংস্কার মনা? বা ভূত প্রেতাত্মার গল্প বলতে পটু?
– আগের যুগের মানুষ। কুসংস্কার তাদের রক্তে মিশে গেছে। সেসব গল্প ছাড়া ও যুগের মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়।
– আপনার মেয়েকে সে কেমন জানে? আপনি আর বিয়ে করেননি?
– খুব একটা ভালো জানেনা। ছোটো বেলায় আমার জন্য ফারিয়াকে পালছে। জোর করে মা ভূইতা গ্রামের এক মেয়েকে  বিয়ে করান। তারপর থেকে সেই ফারিয়াকে দেখা শোনা করেছে।
– যখন বিয়ে করেন তখন ফারিয়ার বয়স কতো ছিলো?
– ১০ মাস হবে আরকি।
– সৎ মা হিসেবে কেমন?
– ফারিয়া ৯ বছর অব্দি বিশ্বাস করতো এই তার মা।
– তারপর কী হলো?
– আমার মা কথায় কথায় বলে দিলেন, লিমা ওর সৎ মা। তাতে অবশ্য মা মেয়ের সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দুই একদিন লিমা আর ফারিয়া বেশ কান্নাকাটি করছে এই আরকি।
– জন্মের পর ফারিয়ার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখেছেন? যেমন ধরুন কথা বলা শুরু করাটা একটু দেরিতে। হাঁটতে শেখা দেরিতে এসব কিছু?
– না।
– স্বপ্নটা দেখা শুরু করেছে আনুমানিক কবে থেকে?
– ৫ বছর আগে হঠাৎ ভোর বেলা চিৎকার করে উঠে কাঁদতে শুরু করে।
– ফারিয়া তো বললো ৫-৬ বছর?
– কেনো বলেছে জানিনা। হয়তোবা ৬ বছর আগে থেকেও দেখতে পারে।
– ও চঞ্চল চড়ুই স্বভাবের নাকি চুপচাপ?
– আগে ছিলো চঞ্চল স্বভাবের। আর এখন শুধু দিন রাত তার ঘরে লাইট জ্বালিয়ে বসে থাকে। ঘুম যখন আটকে রাখতে না পারে তখন ঘুমায়।
– আচ্ছা আজকে এই পর্যন্ত থাকুক। আপনার মোবাইল নাম্বার টা দিয়ে যান কোনো প্রশ্নের উত্তর জানার প্রয়োজন হলে জানাবো। আর ফী টা?
রশীদ আলম চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে পকেটের আধা ছেঁড়া মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার চকচকে নোট টা আফতাব হোসেনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন
– একটু তাড়াতাড়ি করবেন। মেয়েটা বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতে!
– দেখুন আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করবো।
ফারিয়ার পানির পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। বিছানা ছেড়ে উঠে টেবিল অব্দি যাওয়ার শক্তি তার নেই। ১ ঘণ্টা আগে বমি করে তার ঘরের ফ্লোরের কিছু অংশ নষ্ট করেছে। লিমা ফ্লোর পরিষ্কার করে, লিমাকে গোসল করিয়ে রান্নার কাজে মন দিয়েছে।
মা এখন ব্যস্ত, পানি কে দিবে? দাদীকে তার ঘরের আশপাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তার কাছে পানি খেতে চাওয়া মানে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া।
আজকে ৩ বার বমি করেছে দিন রাত্র মিলিয়ে। কিন্তু তার মা একটুও বিরক্ত হয়নি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছে। দাদী অবশ্য স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি।তার বিষয়ে ভালো জিনিসগুলোও তার দাদী স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেন না। সবকিছুতে দোষ তিনি খুঁজে বের করবেনই। আর কথায় কথায় মাকে খুঁচিয়ে বলবেন
– সতীনের মেয়েকে কেউ এতো প্রশ্রয় দেয় নাকি? বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াচ্ছো আর আলসের কুমড়ো বানাচ্ছো।
তখন ফারিয়ার খুব কষ্ট হয়। সে যদি সুস্থ হতো অন্যদের মতো তাহলে সেও মাকে একা কাজ করতে দিতো না। মা কতো রাতে ঘুমুতে যায়।
লিমা দুকাপ চা নিয়ে ফারিয়ার ঘরে ঢুকলেন।
ফারিয়া উঠে বসলো। লিমা এক কাপ চা ফারিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন
– চায়ের সাথে বিস্কুট খাবি? তোর বাবা আজকে দুপুরে ক্রিম বিস্কুট এনেছেন। খাবি?
– হা, মা আনো। ফাহাদ কী করে মা?
– ওকে স্কুলের হোম ওয়ার্ক করতে দিয়েছি। ডেকে আনবো?
– না, আজকে ওর সাড়াশব্দ তেমন পেলাম না তো।
– পড়াশোনার চাপ বেড়েছে তো……
লিমা বিস্কুট আনতে তার শোবার ঘরে গেলেন। মিথ্যা বলতে বেশি পটু না লিমা। শাশুড়ী আম্মা ফাহাদকে ফারিয়ার সাথে মিশতে দিতে চান না। ওর সাথে মিশলে একই রোগ ধরবে। কীসব বাজে কথা!
মনের রোগ আবার ছোঁয়াচে হয় নাকি?
তবে মন খারাপ ছোঁয়াচে। ফারিয়ার বাবার, ফারিয়ার, ফাহাদের মন খারাপ হলে তারও হয়। কিন্তু ফাহাদের দাদীর মন খারাপ হলে মনে মনে তিনি শান্তি পান। খুব জ্বালানী টাইপের মানুষ, খুবই!
রশীদ আলম চলে যাবার পর রেহানা বেগম  স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন
– ওনার মেয়ের সমস্যা তাই না?
– হ্যাঁ।
– ওনার প্রথম স্ত্রী মনে হয় ভালো না। তা না হলে বাচ্চা রেখে যায় নাকি।
আফতাব হোসেন ঠান্ডা স্বরে বললেন
– কোনো মানুষকে একজনের বর্ণনায় বা বিচারে বিচার করা উচিৎ না। একজন নারী যখন তার সংসার ছেড়ে পালায় তখন তার পিছনে অনেক কারণ জড়িত থাকে। আর সেখানে সন্তান রেখে পালিয়েছে! বুঝতে পারছো ব্যাপারটা? আর মনে করো আমি, এই আমাকে অনেকেই পাগল বলে। কিন্তু তুমি কি তাই বলো?
রেহানা বেগম বললেন
– মাথা খারাপ!
– অনেকে আমাকে ছ্যাচড়াও বলে। তাই বলে কি আমি তাই? হয়তোবা তার সাথে এমন কিছু করেছি যার কারণে সে আমাকে ছ্যাচড়া বলে। তাই বলে তো আমি সবার সাথে করিনি। এক পক্ষের কথা শুনে কোনো মানুষকে বিচার করবে না। মনে থাকবে?
রেহানা বেগম প্রশ্নের উত্তরটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বললেন
– ওনাকে রাতে খেয়ে যেতে বলতা?
– নাস্তাই তো দিতে চাওনি। হাজারটা অভাবের কথা বলে কান ঝালাপালা করে দিলা। আবার বলছো রাতে খেয়ে যাওয়ার কথা? তাহলে তো আমার কান বয়ড়া হয়ে যাবে!
আহা! নারী, তুমি জাতটাই বড় অদ্ভুত! তোমায় বোঝার ক্ষমতা কোনো নরের নেই, সত্যি নেই।
চলবে……
© Maria Kabir

 

একটি পানকৌড়ির গল্প…!  পর্ব – ১ 

একটি পানকৌড়ির গল্প…..  পর্ব ২

একটি পানকৌড়ির গল্প…..!   পর্ব –৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here