একটি পানকৌড়ির গল্প….. পর্ব –৫

0
1754
 একটি পানকৌড়ির গল্প…..
পর্ব –৫
ফজরের আজান দিচ্ছে লিমা বুঝতে পেরে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন। পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন নিশ্বাস ঠিকঠাক মতো নিচ্ছেন কিনা? লিমার রাতে ঘুমাতে যাবার আগে মনে হয় পাশে শুয়ে থাকা মানুষ টাকে সকালে মৃত ব্যক্তি হিসেবে দেখবে। উষ্ণ শরীর হঠাৎ করে খুব ঠান্ডা হয়ে যাবে। ভাবতেই কেমন শরীর শিওরে উঠে লিমার। বিছানা ছেড়ে গুটি গুটি পায়ে বাথরুমে গিয়ে ওজু করে নেয়।
ফজরের নামাজ পড়ে তসবিহ হাতে ফারিয়ার ঘরের দিকে পা বাড়ালো। ফাহাদের জন্য তার তেমন চিন্তা হয়না। কারণ সে সুস্থ আর চটপটে ছেলে। চিন্তা হয় তার সতীনের রেখে যাওয়া মেয়েটাকে নিয়ে! যদি ওর নিজের মা থাকতো তাহলে ওর সাথেই ঘুমাতো। ওকে সবসময় আগলে রাখতো। লিমা কি তার নিজের মায়ের মতো করতে পেরেছে?
রশীদ আলম বলেন
– তুমিই ওর মা।
কথাটা শুনতে লিমার খুব ভালো লাগে। তিনি প্রায়ই কথাটা শোনার জন্য রশীদ আলম কে বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করেন। এমনভাবে প্রশ্ন করেন যাতে উত্তর ওই একটাই হয়
– তুমিই ওর মা।
ঘুমন্ত অবস্থায় প্রত্যেক মানুষকে হয়তোবা খুব সুন্দর লাগে। যেমন তার স্বামী, মেয়ে আর ছেলেটা কে খুব সুন্দর লাগে।
ফারিয়া গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। হয়তোবা তার ক্লান্তি খানিকটা বেশি।
ওকে কি ডেকে তুলবে? নাকি ঘুমুতে দিবে? কতো দিন পর গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে মেয়েটি সে খবর লিমা জানে।
প্রথম যেদিন মেয়েটা স্বপ্নের কথা সবাইকে বলল, কেউই বিশ্বাস করেনি। কিন্তু লিমা করেছিলেন। তার বিশ্বাস ফারিয়া কখনো মিথ্যা বলবে না। আজকাল অবশ্য মেয়েটা তার বাবাকে মিথ্যা কথা বলে। বাবাকে সে হাসি মুখে বলবে
– বাবা, ভালো আছি আমি। খুব ভালো বাবা।
লিমা সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়েকে ডাকবেন না। আজকে একটু ঘুমাক, একদিন না দেখতে বের হলে তেমন কিছু ঘটবে না।
রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের পানি চুলায় দিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভোর হওয়া দেখার জন্য বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। আজকের ভোর বেলাটা অন্যদিনের চেয়ে অন্যরকম! কিন্তু অন্যদিনের সাথে কোনো পার্থক্য তো নেই। তাহলে? আজকে মন ভালো তাই সকালটাকেও ভালো লাগছে। এমন কিছু হবে হয়তো। তার ভালো লাগা একটা ভোর ফারিয়া দেখতে চেয়েছিলো!
বেশ তাড়াহুড়ো করে চায়ের পাতিলে পানি একটু বেশি দিয়ে দিলো। মেয়েকে ডেকে উঠানোর জন্য বেশ দ্রুত মেয়ের রুমে ঢুকলেন……
রিয়াদ ও রায়াদ কে রেহানা বেগম বারান্দায় কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। রেহানা বেগম প্রায়ই এমন করেন। যখন তার ছেলে দুটো কথা শুনতে চায়না, পড়াশোনায় মন দেয়না তখন তিনি কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন। রাতের বেলা বিধায় তারা বারান্দায় স্থান হয়েছে। দিন হলে বাড়ির মেইন গেটের সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকে দুই ভাই।
দুই ভাইয়ের এখন আর লজ্জা লাগেনা। প্রথম প্রথম লাগতো এখন সহ্য হয়ে গেছে। এখন তারা এই শাস্তিকে উৎসব হিসেবে পালন করে।
আফতাব হোসেন স্ত্রীকে ডেকে বললেন
– ছেলেদেরকে অনেক শাস্তি দিয়েছো এখন পড়তে বসাও।
রেহানা বেগম কোনো উত্তর দিলেন না। মাথা নিচু করে রান্নাঘরে চলে গেলেন। ছেলেদের নিয়ে সে চিন্তিত। পড়াশোনা তেমন করতে চায়না।
আফতাব হোসেন তার নতুন খাতাটিতে পেন্সিল চালিয়ে যাচ্ছেন। কলম দিয়ে জটিল সমস্যার সমাধান করা ঠিক না। জটিল সমস্যা গুলো এমনিতেই জটিল হয়। তার উপর যদি খাতা জুড়ে কাটাকাটি থাকে তাহলে বিষয়টা আরো জটিলে রূপ নেয়। পেন্সিল দিয়ে লিখলে রাবার ব্যবহার করে ভুল টাকে মুছে ফেলা যায়। তাই কাটাকাটি হবার সম্ভাবনাও নেই। আফতাব হোসেন এটাই মন প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করেন।
মেয়েটা অল্প বয়সে কি ভয়ংকর একটা স্বপ্ন দেখে। কিন্তু উচিৎ ছিলো সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখার। যে স্বপ্নে খেলার সাথীদের নিয়ে মজা করছে বা দূরে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে এরকম ঘটনা ঘটবে। স্বপ্নে বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি, জোনাকী পোকা দেখবে। তা না স্বপ্নে অন্ধকার আর রক্ত মাংস দেখে!
স্বপ্নে ঘ্রাণ পাওয়া সম্ভব না। কিন্তু মেয়েটি পাচ্ছে! মেয়েটি যখন স্বপ্নের বর্ণনা দিচ্ছিলো তখন তার বলার ভঙ্গিতেই বুঝতে পারা যায় সে একবিন্দুও মিথ্যে বলছেনা। মেয়েটি সত্যি কথা বলেছে। এবং স্বপ্নের প্রভাব তার বাস্তব জীবনে ফেলছে। অন্ধকার রাস্তায় হাঁটছে।সূক্ষ্ম আলোর রেখা আস্তে আস্তে আরো বেশি সূক্ষ্ম হতে থাকে তারপর……
– খাবেনা রাতে?
রেহানার প্রশ্নে বিরক্ত হলেও আফতাব হোসেন প্রকাশ না করে মুচকি হেসে বললেন
– আমি আসছি।
মাঝেমধ্যে বিরক্তি প্রকাশ করা যেমন প্রয়োজন তেমনই মাঝেমধ্যে বিরক্তি প্রকাশ না করাও প্রয়োজন। এতে প্রিয় মানুষ গুলো দূরে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
ফারিয়া নামের মেয়েটির সমস্যা দ্রুত সমাধান করা উচিৎ। শারীরিক সমস্যার জন্য ভালো মেডিসিন ডাক্তার দেখাতে হবে। রশীদ আলমকে বলে দেয়া উচিৎ ছিলো।
রশীদ আলম ঘুম থেকে উঠে মায়ের চিল্লাচিল্লি তে বুঝতে পারলেন তার স্ত্রী আর মেয়ে আবারও ঘুরতে বেড়িয়েছে। প্রায়ই দুজন ভোর বেলা ঘুরতে বের হয়। মা ব্যাপারটা একদমই সহ্য করতে পারেন না। আসলে মা তার মেয়ের ভালো হয় এমন বিষয় সহ্য করেন না। মনে মনে বিরক্ত হলেও প্রকাশ করেন না। মা কষ্ট পাবেন।
ফারিয়া আর লিমা এঁকে বেঁকে চলা কুমার নদের পাশের উঁচু ঢিবিতে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের দিকে নদীর পাড়টা দেখতে অপূর্ব সুন্দর লাগে ফারিয়ার কাছে। লিমার কাছে খুব সাধারণ কিন্তু মেয়েটার আনন্দে তার ভালো লাগে। এই দুনিয়াতে কিছু মানুষ থাকে যাদের কাছে অন্যের সুখ টাই বড়, নিজের টা না। অল্প বয়সে মা – বাবা জোর করে বউ চলে যাওয়া এক বাচ্চার বাপের সাথে তাকে বিয়ে দেন। লিমা প্রথনে রাজি ছিলেন না। মা – বাবা তার সিদ্ধান্তে কষ্ট পাচ্ছিলেন তাই বিয়েতে রাজি হলেন।
স্বামীর সাথে আসার আগে তার বাবা ডেকে আদুরে কণ্ঠে বুঝালেন
– তোমার স্বামীর ছোট্ট একটা মেয়ে আছো জানো?
লিমা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিলেন।
– তাকে নিজের মেয়ের মতো জানবে। আর আল্লাহর কতো রহমত যে তুমি একজন অসহায় মেয়ের মা হতে যাচ্ছো। এই দুনিয়াতে যার মা নেই সেই অসহায়। বুঝতে পারছো কি বলছি।
– হ্যাঁ আব্বা।
সেই ছোট্ট ফারিয়াকে দেখে লিমার বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠেছিলো। মেয়েটার যে ভরপুর অযত্ন হয়েছে সেটা তার চোখে আর শরীরে ভেসে উঠেছে। ১০ মাসের বাচ্চা দাঁড়াতে জানে একটু একটু করে হাঁটতে শেখে কিন্তু এই মেয়ে অপুষ্টির কারণে ঠিকঠাক মতো দাঁড়াতে পারেনা।
চলবে……..
© Maria Kabir

 

একটি পানকৌড়ির গল্প…!  পর্ব – ১ 

একটি পানকৌড়ির গল্প…..  পর্ব ২

একটি পানকৌড়ির গল্প…..!   পর্ব –৩

 একটি পানকৌড়ির গল্প…..  পর্ব –৪. 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here