অভিশপ্ত_রাত(৪র্থ-পর্ব)

0
888

অভিশপ্ত_রাত(৪র্থ-পর্ব)

Umme Nipa

উপমা কলেজ থেকে পাক্কা দু মাসের ছুটি নিয়েছে।তার প্রথম সন্তান আসাকে কেন্দ্র করে তার আনন্দের শেষ নেই।

শিহাব মর্গে গিয়ে মায়াকে যেখানে রাখা হয়েছিল তার আশপাশ দেখছে।কোথাও কিছু নেই।এরই মাখে উপমার কল।রিসিভ করতেই ক্লান্ত স্বরে উপমা বললো,দেখোনা শিহাব সেন্সলেস হয়ে পরে গিয়েছিলাম।ভাগ্যিস মায়া এসে আমায় পানি দিল।ও না থাকলে যে কি হত?তুমি তো ছুটি ও নিলেনা!সন্তান কি আমার একার শিহাব?

শিহাব বুঝতে পারছে উপমা ঠিক নেই।ও বার বার মায়াকে দেখছে।যেখানে মায়ার অস্তিত্ব নেই।

উপমা: কি হল?আসবে কখন?

শিহাব: উপমা আমায় সিরিয়াস্লি বলবে একটা কথা?

উপমা: তুমি বাসায় আসো আমার খুব ক্লান্ত লাগছে

আজকাল শিহাবের কাজে খুব বেঘাত ঘটছে।কাজে মন দিতে পারছেনা কোন ভাবেই।তার ছুটি নেয়া উচিৎ। সেবক লুতফর দৌড়ে এসে বললো,স্যার আপনাকে সেলিম স্যার ডাকছেন।

শিহাব: হাপাচ্ছো কেন তুমি?

লুতফর: স্যার আপনে জলদি যান

শিহাব ডাঃ সেলিমের চেম্বারে যেতেই সেলিম চিন্তা স্বর নিয়ে বলছে,শিহাব আমি কি বুড়ো হয়ে গেলাম?

শিহাব মনে মনে ভাবছে গুরুগম্ভীর লোকটা হঠাৎ রসিকতা কেন করছে?

স্যার বয়স টা বেপার না।দক্ষতাটাই বেপার।

সেলিম দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললো,আজ সকালে একটি লাশ এলো।৫তলা থেকে মাথায় ইট পরে লোকটির মাথা থেতলে যায়। আমি চেক করেও দেখেছি সে মারা গিয়েছে সাথে সাথে।

শিহাব: তাহলে?

সেলিম: মৃত মানুষকে নড়তে দেখেছো কখনো?

শিহাব: মানে?

সেলিম: চলো আমার সাথে।আমি লাশ টা রেখে এসে পুলিশদের সাথে কথা বলছিলাম।দরজা থেকে ভিতরে তাকাতে আমি দেখলাম লাশটা নড়ছে।

আমি আবার গিয়ে চেক করলাম।কিন্তু সে মৃত তখনো। কিন্তু আমার এখনো খেয়াল আছে শিহাব আমি তাকে হাত পা ছড়াতে দেখেছি।

শিহাব এসব কথা মাথায় ই নিচ্ছেনা। উপমার কথা বার বার মনে পরছে।লাশ ঘরে যেতেই সেলিম শিহাব কে উদ্দেশ্য করে বললো, দেখো কিভাবে ইট পরেছে।মাথা একেবারে থেঁতলে গেছে।এ যদি বেঁচেও থাকতো তাহলেও স্মৃতি শক্তি হিন ভাবে।

শিহাব লাশটার দিকে তাকাতেই ভরকে উঠলো।এ তো মানিক।সেই পুলিশ মানিক এই বলে শিহাব উচ্চকণ্ঠে বলতে লাগলো

সেলিম: তুমি চিনো কি?

শিহাব কথা না বলে লাশ এর হাত পা চেক করে দেখলো।লাশের হাত এর তালুতে গভীর ভাবে ক্ষত।ইট পরে মৃত মানুষের হাতে পোড়া দাগ কি করে থাকতে পারে তার তা জানা নেই।

সেলিম: আমিও তাই ভাবছি।পুলিশের লোক তদন্ত করবেই।

শিহাব: এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয় স্যার,এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয় এ বলে দৌড়ে চলে গেল শিহাব।

শিহাব স্বজোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে ১৫মিনিট যাবত। উপমা দরজা খুলছেনা।শিহাব উপমা উপমা বলে অনর্গল ডেকেই চলেছে।

প্রায় ২০মিনিট পর উপমা দরজা খুলতেই শিহাব উপমাকে শক্ত করে জড়িয়ে কান্না করে দিল

উপমা: এই কি হয়েছে?শিহাব?কি হল কান্না করছো কেন?

শিহাব: তুমি ঠিক আছো?

উপমা: তোমার সামনে সুস্থভাবে দাড়িয়ে আছি তাও জিজ্ঞেস করো?

শিহাব: কই ছিলে এতক্ষণ?

উপমা: দেখোনা মায়া হাত টা পুড়িয়ে এসেছে কোত্থেকে যেন?

শিহাব: উনি এসেছে কখন?

উপমা: তুমি যাবার পর পর ই।মেয়েটা আবার ফিরে এসেছে।আমার খুব ভালোলাগছে।

চলো ভিতরে যাই উপমা।

হুম চলো,দেখ মেয়েটার পোড়া ঘা তে কি দেয়া উচিৎ। আমি বরফ দিয়েছি।

শিহাব ভিতরে যেতেই দেখছে কেউ নেই।

কোথায় মায়া?উপমা এদিক ওদিক তাকিয়ে বলছে এখানেই তো ছিল ও।কই গেল বলতো?

শিহাব বুঝছে এগুলো সব ই উপমার কল্পনা।

উপমা উদগ্রীব হয়ে খুঁজে চলেছে।শিহাব উপমার হাত ধরে বলছে,এই শরীর নিয়ে এভাবে চিন্তা করা কি ঠিক ম্যাম?

উপমা: দেখো না মেয়েটা হাত পোড়া নিয়ে কই গেল?

শিহাব: ক্ষুধা লেগেছে চলো খেতে যাই। রান্না করেছো?

উপমা আনমনা ভাবে উত্তর দিল হুম।

শিহাব উপমাকে নিয়ে বসালো।নিজে খাবার এনে উপমার মুখে তুলে দিতেই উপমা চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে দিল।

শিহাব: কাঁদছো কেন?

উপমা: এক জীবনে এত সুখ আমি নিব কি করে শিহাব?স্বামী সন্তান সব সুখ কি করে পায়?

শিহাব মুচকি হেসে উপমাকে জিজ্ঞেস করলো কোথাও ঘুরতে যাবে?

উপমা: আমি ছুটি নিয়েছি ২মাস যাওয়া যায়।

শিহাব: গ্রামে যাবে?নীমতলি?

উপমা: ওখানে মামা থাকেন।এছাড়া কেউ না।এত জায়গা রেখে ওখানে?

শিহাব: তোমার ইচ্ছে করেনা শৈশবের জায়গায় যেতে?

উপমা: হুম করে।অনেক করে।মাকে নিয়ে যদি যাই কেমন হবে?মা বাবার ও অনেক স্মৃতী ওখানে।বাবা মারা যাবার পর মা প্রায় ই বলতো ওখানে যাবার কথা।
শিহাব: আচ্ছা আমিও ছুটি নিব ভাবছি।সেকদিন ওখানের মানুষ এর সেবা করলাম।আল্লাহ আমায় সন্তানের মুখ দেখার তৌফিক দিয়েছেন আমার উচিৎ অসহায় মানুষ এর জন্য কিছু করা।

উপমা: মায়াকে বললে ও খুব খুশি হবে।ও কি যে পাগলের মতন বকে।আজ কি হয়েছে জানো?এত জিজ্ঞেস করলাম হাত পুড়লো কি করে?বলে পুলিশকে চরম শিক্ষা দিতে।

শিহাবের চট করেই মনে পরলো মানিকের হাতে পোড়া দাগের কথা।তার মানে কি মায়া ই মারলো মানিক কে?কি করে পসিবল?

উপমা নীমতলি যাব না।আমরা অন্য কোথাও যাই।

উপমা: বউকে আশা দেখিয়ে এখন ভেঙে দিবা ডাক্তার মশাই?ভালো কাজে পিছিয়ে যেতে নেই।তুমি খেয়ে নেও আমি আর খাবনা।

৫দিনের মাথায় উপমা সব গুছিয়ে নিয়েছে।মায়া বিছানার পাশে বসে হাসছে।

উপমা: হাসছিস কেন?আচ্ছা তুই কই উধাও হয়ে যাস রে?

মায়া: বান্ধুবীর আর তার জামাইর প্রেম দেখলে আমার খুব হিংসা হয় জানিস?

উপমা: রাখ তো।তামাশা শুধু।তুই কই যাস বল?

মায়া: যাই এক জায়গায়।বার বার তোর বাচ্চার কথা মনে আসে তাই চলে আসি দেখতে।

উপমা: তুই যাবি নীমতলি?

মায়া মুখ মলীন করে বলছে,ওখানেই তো আমার শেষ ঠিকানা রে

উপমা: কি বলিস?

মায়া উঠে দাড়ালো।আমি যাব এখন

উপমা: থাক না।দুপুরে কিছু খেয়ে যা। এখন ই ও আসবে

মায়া: অন্যদিন।তুই খেয়াল রাখিস নিজের।আর নিজের মেয়ের

উপমা: আমার যে মেয়েই হবে তা কি করে বুঝলি?

মায়া: আমি বুঝি সব ই।

পুলিশ মানিকের মৃত্যর রিপোর্ট একেবারেই স্বাভাবিক এসেছে।তাকে দাফন করা হয়ে গিয়েছে।শিহাব এখনো নিজেকে বিশ্বাস করায় এটা খুন।স্বাভাবিক মৃত্যু নয়।

নীমতলী ছোট গ্রাম হলেও অনেক উন্নত জায়গা।শিহাব একটি ভাড়া বাসা ঠিক করেছে।দু রুম চারপাশে বাগান।পিছনে খোলা জায়গা।বিশাল পুকুর। বাসা ঠিক করে দিয়েছে উপমার মামা নিজাম।তাদের বাসার কাছাকাছি।এত বড় বাড়ি। বাড়ির মালিক থাকেন ঢাকা।গ্রামে কেউ ভাড়া থাকেনা বলেই চলে।মাত্র ১৫০০টাকায় ভাড়া নিয়েছে তারা।

উপমা খুব খুশি।এতদিন পর যেন খোলা প্রকৃতি দেখে তার বেশ ভালো লাগছে।পুকুরঘাটে বসে শিহাবকে বলছে ছোটবেলায় এমন পুকুর দেখেছি।কতকাল বাদে দেখলাম শিহাব।

শিহাব: মা আসলে ভালোই হত।

উপমা: ভাবি অসুস্থ খুব।এমন অবস্থায় কি করে আসবে।শিহাব আমরা এখান থেকে অল্প কিছু দূরে থাকতাম।যাবে?

শিহাব: হুম যাব। আচ্ছা মায়ার বাসা কই ছিল?

উপমা: আচ্ছা তুমি এত মায়াকে নিয়ে আগ্রহ কেন?কি হয়েছে?

শিহাব: আহ এমনেই জিজ্ঞেস করলাম।ওকে কেন ওর বর তাড়িয়ে দিল তাই জানা উচিৎ তাইনা?

উপমা: ওকে কতবার বললাম আমার সাথে আসতে আর খোঁজ ই পেলাম না।

শিহাব: ঘরে চলো।সন্ধ্যা হয়ে গেছে।এখন বাইরে থাকা উচিৎ হবেনা

উপমা: তুমি এসব বলছো?এসব ব্লিভ করো?

শিহাব হেসে বললো,ডাক্তার এর চেয়েও তো আমি কারো বাবা তাইনা?সন্তানের জন্য চিন্তা হয়না বুঝি?
ইদানীং উপমা বার বার স্বপ্নে ফুটফুটে কন্যা সন্তান দেখছে।কিন্তু অদ্ভুত বিষয় মেয়েটা উপমার কোল থেকে বার বার মায়ার কোলে হাত বাড়াচ্ছে।একই স্বপ্ন দেখতে দেখতে উপমা চিন্তায় পরে গিয়েছে।আজ ভোর রাতেও সেই একই স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায় উপমার।পাশে শিহাবকে না দেখতে পেয়ে উপমা উঠে বসে।গ্রামে রাত ১০টার পর বিদ্যুৎ থাকেনা।আগে বিদ্যুৎ ছিলইনা।এখন তাও পাওয়া যায়। উপমা দরজা খোলা দেখে বুঝেছে শিহাব উঠোনে বসে আছে।বিদ্যুৎ না থাকলে এমন ভাবেই চেয়ারে বসে থাকে।চাঁদের আলোয় উঠোন আলোকিত।উপমা শিহাব ডাকতে ডাকতে উঠোনে নামলো।শিহাব সাড়া দিচ্ছেনা।চেয়ারে কেউ যে বসে আছে তা উপমা দিব্বি দেখতে পাচ্ছে।

শিহাব তুমি ওখানে?শিহাব?

কাছে যেতেই দেখলো মায়া চেয়ারে বসে আছে।উপমার দিকে তাকিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বললো খুব কষ্ট রে আমার। ওরা আমার মেয়েকে মেরে ফেলছে উপমা।বাচা আমায় তুই।

উপমা মায়ার বিকৃত মুখ দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে সেন্সলেস হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরলো…

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here