অনুরাগ ৮ম পর্ব

অনুরাগ
৮ম পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘আমি কী তোমার বাসায় যাচ্ছি?’
-‘হ্যাঁ।’
-‘সত্যি?’
-‘মিথ্যা হবে কেনো?’
-‘আমি কী আজ থেকে তোমার সঙ্গেই থাকবো?’
-‘অবশ্যই।আমার সঙ্গে থাকবেনা তো কার সঙ্গে থাকবে তুমি?’
-‘ওখানে আর আমাকে ফিরে যেতে হবেনা? ওরা যদি আমাকে কখনো নিতে আসে আবার?’
-‘আর আসবেনা ওরা বাবু।তুমি এত চিন্তা করছো কেনো?এখন তো আমি আছি তোমার সঙ্গে তাইনা?’

গাড়িতে বসে পুলক বাবলীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাড়িতে পৌঁছে গেলো।বাবলী ছোট বাচ্চাদের মতো পুলকের বাহু জড়িয়ে ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।শ্রুতি কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে ওদের দুজনকে একসাথে দেখে না চাইতেও চমকে গেলো।
পুলকের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।আর বাবলী মেয়েটা খুব ভীত চোখে তাকিয়ে দেখছে শ্রুতিকে।
শ্রুতি দরজার মুখের সামনে থেকে সরে দাঁড়াতে ওরা ভেতরে ঢুকলো।ড্রয়িংরুমে তানিয়া,মেঘলা, ঈশাণ,রবিন,নিশাদ সবাই বসে আছে।সবারই মুখের ভাবটা গম্ভীর।পুলকের সঙ্গে ছবিতে দেখা ওই মেয়েটিকে দেখে সবাই বেশ চমকে উঠলো। কেউ কিছু বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেনা।শুধু তাকিয়ে দেখছে দুজনকে।

-‘বাহ্ তোরা সবাই আছিস দেখছি।ভালোই হয়েছে।সবটা সবার সামনেই পরিষ্কার হবে।’
রবিন বললো, ‘ও কে পুলক?’
-‘ও বাবলী।’
-‘সেটা তো ওর নামের পরিচয়।’

শ্রুতি শান্ত ভঙ্গীতেই বললো পুলককে।পুলক বললো, ‘ও আমার ছোট বোন শ্রুতি।আমার একমাত্র ছোট বোন।যাকে আমি সেই এগারো বয়স হারিয়েছিলাম।’

পুলকের উত্তরে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলো।শ্রুতিও একদম চুপ হয়ে গেলো।ওরা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু।ঈশাণ হঠাৎ এর মধ্যে খিক করে হেসে উঠল।বললো, ‘কারো কোনো কমেন্ট আছে?’

সবাই নিশ্চুপ।এ্যাটেনশন এখন সবার ঈশাণের দিকে।পুলকও চেয়ে আছে ওর দিকে।কী বলতে চাই তা শোনার আশায়।ঈশাণ উঠে এসে পুলকের সামনে দাঁড়াল পকেটে হাত গুজে।বললো, ‘এত লো ক্লাসেস বুদ্ধি পাস কই?’

-‘তোর সমস্যা কোথায় বল তো ঈশাণ?’
-‘এটা তো আমি জিজ্ঞেস করবো আমি?কেনার সময় কী বোন বলে কিনেছিস?’
-‘ঈশাণ….!’

চিৎকার করে উঠলো পুলক।ঈশাণ আবারো বললো, ‘কিনেই তো এনেছিস।মিথ্যে বলেছি কী?রবিন স্বাক্ষী আছে এখানে।আর সব থেকে বড় স্বাক্ষী ওখানকার সর্দারনী।ফোন দিই?কী বলিস?তুই দিবি নাকি আমি দিবো?’

ঈশাণ পুলককে সর্দারনীর নাম্বারটা দেখিয়ে কল করলো তাকে।কলটা স্পীকার করে সবাইকে শুনালো পুলক কীভাবে কত দামে বাবলীকে ওখান থেকে কিনে নিয়েসেছে।আর সব থেকে বড় যে কথাটা সেটা হলো সর্দারনী জানিয়েছে বাবলীকে পুলক বিয়ে করবে বলে সে ওকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে কিনে এনেছে।কোন বোন পরিচয়ে আনেনি এখানে।শ্রুতি ধপ করে ফ্লোরে বসে পরলো।মেঘলা,তানিয়া ওকে দ্রুত গিয়ে ধরে বসল।পুলক ঈশাণের কাছ থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে সর্দারনীকে বললো, ‘এই কী বলছেন আপনি?এসব কী বলছেন?বাবলীকে আমি বিয়ে করবো বলে…..।ছিঃ ও আমার বোন।আমি কত কষ্টে ওর সন্ধান পেয়েছি আপনি জানেন।হ্যালো হ্যালো…..?’

ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গিয়েছে।পুলক ঘুরে তাকিয়ে দেখলো শ্রুতি মেঘলার বুকে মাথা রেখে ফ্লোরে পাথরের মতো বসে আছে।তাকে খুবই অস্বাভাবিক লাগছে।ওর কাছে গিয়ে পুলক বললো, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করছোনা,হ্যাঁ? এই শ্রুতি?তোমার বিশ্বাস হচ্ছেনা আমার কথা? বাবলী আমার বোন।ছোট থাকতে আমার মামা একদিন রাতে ঘুমের মধ্যে ওকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো আমার কাছ থেকে।ও তখন খুব ছোট ছিলো।আমি ওকে কোথাও খুঁজে পাইনি।সপ্তাহ খানেক আগে আমার সেই মামা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার জন্য।আমাকে জানায় সে ক্যান্সারে আক্রান্ত।এডিক্টেড ছিলো খুব সে।আমি তাকে টাকা দিতে রাজি না হলে সে আমাকে বাবলীর কথা জানায় বাবলীকে সে কোথায় চুরি করে রেখে এসেছিলো।আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি বাবলী এখন টাঙ্গাইল।আর আমি সেদিনই তোমাকে অফিসের কাজের কথা জানিয়ে টাঙ্গাইল যাই ওকে ফিরিয়ে আনতে।আমি……’

-‘থাম ভাই।অনেক তো বললি।এবার তোর বাবলীকে কিছু বলতে দে।’

পুলক থম মেড়ে দাঁড়িয়ে আছে।শ্রুতিকে কিছু বলবে তখনই ঈশাণ ধমকে বাবলীকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই মেয়ে তোর সাথে পুলকের পরিচয় কী করে?তোর সাথে ওর সম্পর্ক কিসের?’

এরকম আরো নানারকম প্রশ্ন করলো ঈশাণ বাবলীকে।বাবলীর উত্তর যা ছিল তা শোনার পর পুলক আর এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। শ্রুতি ওর মুখটা অবদি তাকিয়ে দেখেনি।শ্রুতি বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে মেঘলা আর তানিয়ার সাথে।বাবলী কী করে বলতে পারলো পুলক তার দেহ ভোগের জন্য বাড়িতে নিয়েসেছে পতিতালয় থেকে?নিজের বোন হলে এমন কথা সে কখনো বলতে পারতোনা।এসব ভেবে পুলকের মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে একদম।এর মধ্যে কখন যে শ্রুতি মেঘলা আর তানিয়ার সাথে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে পুলক তা লক্ষ্যও করেনি।একে একে বাসাটা পুরো খালি হয়ে গেছে।পুলক মেঝেতে বসে আছে।

-‘জীবন টা আবারও আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেললো।’

এটায় ছিলো পুলকের শেষ কথা।এরপর প্রায় তিন বছর কেটে যায়।পুলকের কোনো সন্ধান মিলেনি।শ্রুতি যখন নিজের বাড়িতে ফিরে যায় তার কিছুদিনের মাথায় ওর ফ্যামিলি শ্রুতিকে বাধ্য করে পুলককে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে। পুলকের ঠিকানাতে ডিভোর্স লেটার পৌঁছালেও পুলককে আর পাওয়া যায় না।তার আগে পুলক বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলো শ্রুতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে।কিন্তু পারেনি আর তার এক সপ্তাহ পর থেকেই পুলক হারিয়ে গেছে কোথাও।কেউ ই তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি।

_

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here